নষ্টালজীয়া - Nostalgia

আজকের সকালটা অন্য দিনের মত নয়, ঘুম ভাঙতেই দেখি মেঘলা আকাশ, মনটা ছটফট করছে, না জানি কি অনিশ্চয়তা ঘাপটি মেরে আছে। আজকে হল ছেড়ে চলে যেতে হবে, হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ দিন। জিনিষপত্র গুছিয়ে রিক্সায় রওয়ানা হলাম্, আপাতত গন্তব্য ধানমন্ডি ফুপুর বাসা ( এই একটাই ঢাকা শহরে, অনিশ্চয়তায়, নিশ্চিত আশ্রয় )। চোখে শুধু ভাসছে অসংখ্য স্মৃতি - মল চত্বর, হাকিম চত্বর, টিএসসি, ডাস, কলা ভবন, মধুর ক্যান্টিন, লাইব্রেরী ভবন। কখন যে চোখটা ভিজে এল, বুঝতে পারলাম না। রাস্তায় আসতেই চোখে পড়ল, সাড়ি বেধে দাড়িয়ে থাকা পুলিশ ও আর্মির গাড়ি। সময়টা ১৯৯০ সাল, যাকে বলা হয়, নব্বই এর গণ অভ্যুথান। এরশাদের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

মনে পড়ে যেদিন বিম্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, ক্লাশ শুরু হ’ল। হল থেকে বেড়িয়েছি, দেখা হ’ল আরও কয়েকজন যুবকের সাথে, জানলাম আমার সাথেই ভর্তী হয়েছে, একই বিষয়ে পড়বে, অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা। সবার বাড়ী কুমিল্লা। আমার বাড়ী বরিশাল শুনে কিছুটা বাঁকা দৃষ্টিতে তাকাল। একটু কটাক্ষ করল কিনা বুঝতে পারলাম না্ আসলে এ সময় যে বরিশাল আর কুমিল্লার দা-কামড়া সম্পর্ক। যাহোক বলে রাখা ভাল, পরবর্তী জীবনে এরাই ছিল আমার ব্শ্বিবিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে সেরা বন্ধু ও এখনও যোগাযোগটা অটুট আছে। জিয়া, শামীম, হাবীব, হুমায়ুন ও আরও অনেকে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম অবিজ্ঞতা, বলে বোঝানোর মত নয়, নতুন বন্ধু-বান্ধব। টিএসসি তে হেটে বেড়ান, আড়-চোখে মেয়েদের দিকে তাকানো। এটা হয়তঃ বুঝতে পেরে মেয়েরাও বিউটি কনটেস্টে নেমে পড়েছে। অযথাই হাসছে, আর আড়-চোখে তাকাচ্ছে। কে কে ফলো করে দেখার জন্য। টিএসসি ক্যাফেটারিয়ার খাবার এত মজা, আর দামও অনেক কম, কিন্তু হায়, পকেটে যে যত সামান্য পয়সা। এবার না হয় বাদ, আরেক দিন হবে। কেউ যদি অফার করে, রাজী হতে দেরী হয় না। এই সুন্দর সময়টা থমকে দাড়ায়, মাঝে মঝে শুরু হয়ে যায়, দুপক্ষের মারামারি, আর গোলাগুলি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই খারাপ। কখনও বা পুলিশ হলগুলো রেইড করে, আবার কিছু ‍দিন পর পর হল খালি করার নির্দেশ, ছুটতে হয় দেশের বাড়ী।

আমাদের একবার আয়োজন করা হ’ল ব্যবস্থাপনা বিভাগের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগীতা ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। রাত জেগে বিভিন্ন বর্ষের ছাত্রছাত্রীরা রিহার্সল করল, আর আমি কয়েকজনকে নিয়ে সাড়া রাত জেগে স্টেজ সাজালাম। পরের দিন দারূন অনুষ্ঠান হ’ল। মাঝে মাঝে মনে হয়, আরেকবার কি ফিরে যাওয়া যায়, সেই ফেলে আসা পুরাণ সুন্দর ‍দিনগুলোয়।

১৯৯০ সালের পর অনেক বন্ধু-বান্ধবের সাথে যোগাযোগটা ক্ষীণ হয়ে আসছিল। হঠাৎ দেখা হ’লে, কি রে দোস্ত - কোথায় আছিস, কি করছিস। কেউ কেউ মূখ কাল করে ফেলত। কারণ তখন চাকরীর বাজারে দারূণ মন্দা। এরশাদের পতনের আগ থেকেই এই অবস্থা। যাক আমার চাকরী হ’ল, বেতন যত সামান্য। কিছুদিন পর শুনলাম ব্যবস্থাপনা বিভাগের রি-ইউনিয়ন হবে। সবগুলো ব্যাচ মিলে। গিয়েছিলাম তবে এত লোকের ভীরে কাউকে খুজে পাওয়া দুষ্কর। হয়ত এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য কয়েকজনের উদ্যোগে জন্ম নিল “ম্যানেজমেন্ট নেট”। দশটি বছরের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাচ্ছে এই গ্রুপটি। আমাদের বন্ধু রফিকের অনুরোধে  “ম্যানেজমেন্ট নেট” এর লোগো তৈরী করলাম। জড়িয়ে আছি সংগঠনটির সাথে ওতোপ্রোত ভাবে। তবে অন্যদের মত সময় দেয়া হয়না।

আজ হালখাতার হিসেবে অনেক গন্ডগোল, সময় যায় কিন্তূ অর্জন কতটুকু, কে জানে। স্মৃতি শুধু তাড়া করে ফেরে।

 [শেষ]

Comments

Popular Posts