শেষ বিকেলের চিঠি
🌺
টুপ করে শব্দ হতেই ঘুমটা ভেঙে গেল, ঘুম হয়তঃ গভীর ছিল না, তাই অল্প আওয়াজ হতেই টুশ। মন চাইছে না, উঠে দেখি।
কিসের আওয়াজ হ’ল? কিছুক্ষণ এপিঠ ওপিঠ করে উঠে বসলাম। মাথাটা উচু করে তাকিয়ে দেখি, একটা সাদা খাম। খামের উপর সাইন পেন এর নীল কালিতে আল্পনা করা। সহসা এরকম খামে চিঠি আসে না। কে পাঠাল, কোথা থেকে এল। খুলে দেখা যাক, একটু সতর্ক হয়ে নেড়ে চেড়ে দেখছি। উপরে আমারই নাম, নীল কালিতে।
খাটের উপর একটু আরাম করে বসে কোনাটা ছিড়লাম, যাতে খামটা নষ্ট না হয়। পড়তে শুরু করলাম।
”হয়ত এ চিঠি পেয়ে আপনি আশ্চর্য হবেন, কারণ আমি আপনাকে চিনি না, আবার আপনিও আমাকে চিনবেন না।......................”
মাঝে মাঝে চিন্তা গুলো কেমন যেন জট পাকিয়ে যায়, কে এই অপরিচিতা, কিভাবে ঠিকানা জোগাড় করল, লেখার হাতটা তো দারূন। অনেক গুছিয়ে লিখতে পারে। ভাবনার সময় বেশী পাওয়া গেল না। আবার ছুটতে হবে রামপুরা, টিউশনি। একটা রিকশা দশ টাকায় ফুরিয়ে উঠে পরলাম, আজ আর বাসে যেতে ইচ্ছে করছে না। আমার সব থেকে ভাল লাগে, রিকশায় হাওয়া খেতে খেতে কল্পনার রাজ্যে প্রবেশ করা। রিক্সা যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পার হচ্ছে, তখন আবার খামের চিন্তা মাথায় নড়ে চড়ে বসল। এ চিঠিটা একটু অন্য রকম, অনেকটা গল্প বলার মত।
সুহৃদ এর কাছে লেখা এটাই সুপ্রিয়ার প্রথম চিঠি।
#পর্ব_২
🐝
পাটোয়ারীর ক্যানটিনে এখন ছেলে বসে, বয়স মাত্র বার বছর। কিন্তু ভাব দেখলে মনে হয় ত্রিশ বছর। সকালের নাস্তার জন্য কেন্টিনে ঢুকলাম, ৮ টা বেজে গেছে, ভীড় কম। দুটি পরটা, একটা ডাল-ভাজী, এক কাপ চা ৩.১৫ টাকা। ৫ টাকার নোট দিলাম, ২ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলল ১৫ পয়সা খুচরা দেন।
- খুচরা নেই, পরে দিব।
- হু, পরে তো আর দেন না।
ওর ভাব দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, ইচ্ছে হচ্ছে বাঁ হাতে কষে একটা চড় দেই, কথা না বাড়িয়ে কোনার টেবিলে গিয়ে বসলাম, কেন্টিন বয় এসে টোকেন নিয়ে গেল। নাস্তা এসে গেছে, পরটার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, ভেতর থেকে ওপাশ দেখা যাবে। এত পাতলা পরটা বানানো শিল্পের পর্যায় পড়ে। এই দুটা পরটা খেয়ে ১ টা পর্যন্ত পার করা কঠিন। মাসের শেষ দিক, টিউশনির টাকা পেতে আরো ১০ - ১২ দিন। সুকান্ত নামে এক ভদ্রলোক লিখে গেছে, ক্ষুদার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, ব্যাটা পাটোয়ারীর পরটা খেলে অন্য কবিতা লিখত।
সিড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে দেখি ৪/৫ টি ছেলে হুরো হুরি করে নামছে, শরীরের গঠন দেখে মনে হচ্ছে হ্যাঙ্গারে সার্ট ঝুলছে, কিন্তু ভাবসাবে পাহলোয়ান। এরা নতুন ক্যাডারের খাতায় নাম লিখিয়েছে, খুব ভাব নিয়ে তাকালো, পাত্তা দিলাম না। এদের দৌড় আমার জানা আছে, জুতার আবার ফিতা বাঁধে নাই, ভাবখানা এমন আরেকজন বেঁধে দেবে।
রুমে ফিরে এলাম, মনটা খারাপ, প্রায় দু সপ্তাহ পার হল, চিঠির উত্তর পাই নি। বাহিরে হঠাৎ ঝুপ করে বৃষ্টি নামল, কখন যে মেঘ করেছে, খেয়াল করিনি। বৃষ্টির ছাট আসছে জানালাটা ভেজাতে হল। এরকম বৃষ্টির দিনে আম্মা নরম খিচুড়ি রাঁধতেন, সাথে আলু ভর্তা, ডিম ভাজা। কপাল ভাল থাকলে গরুর গোস্ত ভুনা। জিভে জল চলে আসে। কিন্তু আজ আমাকে কে খিচুড়ি খাওয়াবে, ঘির বাগার দেয়া গরম খিচুড়ি আমার কত প্রিয়।
প্রকৃতিরও আজ মন খারাপ।
#পর্ব_৩
🌻
"সুহৃদ,
লিখতে একটু দেরি হয়ে গেল।
দোতালার জানালা দিয়ে হাত বাড়ালেই মনে হয়, কদম গাছটা ছুঁতে পারবো, সাত সকালেই দুটো বুলবুলি তাড় স্বরে ঝগড়া করছে, মনে হয় স্বামী স্ত্রীর মধ্যে গন্ডগোল, আর সেই শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল, এখন কোন ফুল নেই, শ্রাবণে ফুলে ফুলে ভরে যাবে, আর সেই সময়েরই অপেক্ষায় থাকি। আচ্ছা আপনার কোন ফুল পছন্দ? আবার বলবেন না গোলাপ। আমার এক বন্ধু বলেছিল, ওর ধুতুরা ফুল পছন্দ, হি হি হি। প্রচুর অলস সময়, কি করে কাটাবো বুঝে পাই না, আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ঘোষণা কবে দিবে কে জানে।
যাহ, শুধু আমার কথাই বলে যাচ্ছি, আপনার কথা বলেন, কি ভাবে সময় যায়? কি পছন্দ করেন? বলেছেন একটা টিউশনি করেন, ছাত্র না ছাত্রী?
এমনই জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আবার কিছু ভেবে বসে থাকবেন না। আমার এলোমেলো কথা বলার স্বভাব, কে কি ভাবল, ভেবে দেখি না,.................... "
চিঠিতে বুদ হয়ে ছিলাম, আজ ফিরতে দেরি হয়েছে, দশটায় ডাইনিং বন্ধ হয়ে যায়, আমি যখন ডুকলাম, তখন দেখি সাজাহান গুছাচ্ছে। তরকারি আর ডালের বাটি নিয়ে টেবিলে এসে বসলাম, এ দুটি সীমিত। ভাত যতটুকু প্রয়োজন নেয়া যায়। আজ আবার পেঁপে দিয়ে চিতল মাছ রেঁধেছে, পেঁপে আমার একেবারেই অপছন্দ। ভাত শুকিয়ে চাল হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে সিদ্ধ করে নি। এই চাল চিবিয়ে, আমার দুটা দাঁত নড়ে গেছে। খেয়ে দেয়ে রুমে এসে দেখি রুম মেট ফেরে নি। দরজা খুলে আলো জ্বালাতেই মেঝেতে সাদা খাম দেখতে পেলাম, আজ গোলাপি সাইন পেন দিয়ে ঠিকানা লেখা, এক পাশে নক্সা করা। যাক শেষ পর্যন্ত এল, চিঠিটা পেয়ে অপেক্ষার অবসান হল, তাহলে রাগ করে নি। কোনাটা ছিঁড়ে খাটের উপর বসে এক নিশ্বাসে পড়ে ফেললাম।
সুপ্রিয়ার চিঠি পড়লে মনে হয়, বুদ্ধদেব গুহর জলে জঙ্গলে পড়ছি।
হঠাৎ দরজায় টোকার শব্দ, চট করে চিঠিটা বালিশের নীচে লুকিয়ে ফেলি। আমার রুমমেট এসেছে।
- কি ব্যাপার, খেয়েছ? কাপড় বদলাও নি, কখন এলে?
একসাথে অনেক প্রশ্ন।
- এইত মাত্র খেয়ে ফিরলাম, আর আপনি এলেন।
আপনার দেরি হল যে।
হাল্কা বৃষ্টি হওয়ায় বেশ ঠান্ডা পড়েছে, কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি।
হঠাৎ মনে হল, অনেকগুলো ড্রাম বাঝছে নাকি ভুমিকম্প, এত শব্দ কিসের, লাফ দিয়ে উঠে খাটে বসে পড়ি। ড্রামের শব্দ না, অনেকগুলো বুটের আওয়াজ। বাইরে অন্ধকার আর জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, প্যাসাজে পুলিশ গিজ গিজ করছে, হল রেইড দিয়েছে। একজনকে বলতে শুনলাম ৪৪৯ এই দিকে, আমার রুম নম্বর শুনে, শির-দাঁড়া থেকে ঠান্ডা এক ভয়ের স্রোত নেমে এল। দরজায় জোরে কড়া নাড়ার শব্দ, মনে হয় ভেঙে ফেলবে। রুমমেট দরজা খুলতেই হুরমুরিয়ে ৪/৫ জন পুলিশ ঢুকে পরল। কথা নেই, বার্তা নেই, এক এক করে সব কেবিনেট চেক করছে, কোন বইয়ের পেছন বাদ যায় নি। অনেক খোজাখুজির পর, বলল নাহ নেই, সব সড়িয়ে ফেলেছে। বুঝলাম না, কি সড়ালাম। ওরা অস্ত্র খুঁজতে এসেছে। আমার এক বন্ধু, রাজনৈতিক দলের ক্যাডার, মাঝে মাঝে আমার রুমে আসে, ভেবেছে এখানে এসে অস্ত্র লুকিয়ে রাখে। এ যাত্রা বেচে গেলাম। অনেককে দেখলাম লাইন দিয়ে দাড় করিয়ে রেখেছে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি ৪-৩০ বাজে, একটু পর ফজরের আজান দিবে।
আমার আরেক বন্ধু রুবেল এর তিন তলার রুম থেকে পুলিশের কন্ঠ ভেসে এলো, স্যার ককটেল পাইছি, অফিসার ছুটে গেল। নাহ, এই ককটেল সেই ককটেল না। এটা ব্যাঙ্গাত্মক চটি পত্রিকা, তখন এরশাদ কাল, তাকে নিয়ে যত ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন চিত্র। সে সময় এটা ২ টাকায় দারুণ চলত।
পুলিশ তখন চার তলা থেকে পাচ তলার দিকে যাচ্ছে, আর আমার সেই বন্ধুকে দেখলাম, একটা ব্যাগ নিয়ে এদিক ওদিক ছুটছে। নাম ধরে ডাক দিলাম, এই নীচে ফেলে দে, মরবি তো। উপায়ান্তর না দেখে ও ব্যাগটা নীচে ছুড়ে ফেলল। তারপর মাথায় টুপি দিয়ে, নীচে নেমে গেল। পরে শুনেছি, পুলিশ যতক্ষন ছিল, ততক্ষণ ও মসজিদে নামাজে দাড়িয়ে ছিল, ওজু ছাড়া কি নামাজ পড়েছে, ওই জানে, তারাবি পড়তেও তো এত সময় লাগে না।
আকাশ ফরসা হতে, নীচে নেমে দেখি, আট দশজনকে পুলিশ বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে, সাথে ছালার এক ভারি বস্তা, কিছু অস্ত্র পেয়েছে নিশ্চয়।
আজ ক্লাস টেস্ট। সকালের নাস্তাটা হল গেটের সামনে আমীরের দোকানে সাড়লাম, নীচে অনেক মানুষ, কানাঘুষা চলছে। বড় নেতারা আগেই খবর পেয়ে যায়, কেঊই হলে ছিল না।
🚓
(বিঃদ্রঃ গল্পের কোন চরিত্র খোঁজার চেষ্টা না করলে খুশী হব) 😁
#পর্ব_৪
🌾
জৈষ্ঠ্য মাস চলছে, বেশ গরম পড়েছে। একটা ফ্যান কিনবো ভাবছি, ৯০০ টাকা দাম নিবে। তিনটা টিউশনি করে মাসে পাই ১০০০, ফ্যানের পয়সা যোগাড় করা মুশকিল। দরজায় গেটিস দিয়েছি, এটা হলের ভাষা। মানে হল, দরজা একটু ফাঁক করে, নীচের ছিটকিনি ফেলে দেয়া, ওটা মেঝের গর্তে আটকে থাকে। এতে করে বেশ বাতাস আসে, ফ্যানের কাজ হয়। তবে যেদিন বাতাস নেই, সেদিন ঘামে বিছানার চাদর ভিজে যায়।
শুক্রবার দিন ডাইনিং এ ভাল খাবার থাকে, মানে মুরগী রান্না হয়। যারা ১২টায় লাইন দেয়, তারা মুরগীর গিলা-কলিজা পায়। আমরা সাধারণত ১টার পর যেতাম, আর দল বেঁধে গেলে, খেতে খেতে আড্ডাটাও হয়ে যেত। আমাদের হলে এক সপ্তাহের কুপন ৭৭ টাকা দিয়ে কাটতে হত, তাতে দুবেলা খাবার জুটতো। প্রতি বেলায় ৫.৫০ টাকা। হলের ছাত্র - কর্মচারীর যৌথ পরিচালনায় ডাইনিং চলত, সে বৃত্তান্ত পরে হবে।
আমার বন্ধু জিয়া আবার ডাইনিং এ যাবে না। এক পিচ্চি রেখেছে, ডাইনিং থেকে খাবার এনে দেয়। এ বেলা ওকে দিয়ে দুজনার খাবার আনিয়ে জিয়ার রুমেই খাওয়ার পর্ব সেরেছি। খেয়ে দেয়ে রুমে এসে দরজায় গেটিস দিয়ে শুয়ে পড়লাম, রুমমেট নেই, কোথায় গিয়েছে কে জানে। ঘুমটা বেশ গভীর ছিল, শুক্রবার দুপুরের ভাত ঘুম, দারুণ ব্যাপার। আর আজ আকাশে কড়া রোদ হলেও বেশ বাতাস আছে। মনে হচ্ছে নদীতে লঞ্চে যাচ্ছি।
প্রচন্ড এক শব্দে পুরো হলের বিল্ডিংটা কেঁপে উঠল। হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে কিছুই বুঝতে পারলাম না। কাপুনী টের পেয়েছি, আর আওয়াজের ধকলে কানে তালা লেগে গিয়েছে। হঠাৎ মনে হল সবাই ছুটাছুটি করছে, অনেক পায়ের আওয়াজ। কি হল, দরজা খুলে বাহিরে আসতেই দেখি, চারজন মিলে একজনকে পাঁজা কোলা করে নিয়ে যাচ্ছে, পুরো শরীর আর চুল সাদা, মনে হল সিমেন্টের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল, আর মুরগী কাটলে যেভাবে রক্ত টপটপ করে পড়ে, সেভাবে রক্ত পড়ছে। দেখতে দেখতে আরেকজনকে নিয়ে গেল।
এরই মাঝে জিয়া, শামীম, হাবিবসহ অনেকেই চার তলায় উঠে এসেছে। সবাই জিজ্ঞেস করছে, কি হল, এত জোরে আওয়াজ আর ভূমিকম্পের মত বিল্ডিং কেঁপে উঠল। দক্ষিণ দিক থেকে এক ছেলে এসে জানাল, বোমা মেরেছে। কারা বোম মারল?
চতুর্থ তলার দক্ষিণ দিকে ঘটনা ঘটেছে, আমরা এগিয়ে গেলাম সেদিকে, পোড়া বারুদের গন্ধে নাক বন্ধ হয়ে আসছে, রুমের ভিতর উঁকি দিয়ে দেখি মেঝে গর্ত হয়ে গেছে, বাম দিকের দেয়াল ধ্বসে পড়েছে, আর ছোপ ছোপ রক্ত, মাহবুবের সাথে দেখা হল, সে পাশের রুমেই থাকে। ও জানাল, প্রচন্ড শব্দে বিল্ডিং কেঁপে উঠে আর রুম অন্ধকার হয়ে যায়, দরজা দেয়ালে সেঁটে গিয়েছিল, পরে এই ধ্বসে পড়া দেয়ালের ফাঁক দিয়ে বেড়িয়ে এসছে, শুনলাম বাবলু ভাইসহ আরও একজন আহত, হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। কেউ বলল পাশের হল থেকে অন্য রাজনৈতিক দলের ছেলের বোমা ছুঁড়ে মেরেছে, কেউ বলছে এই রুমে ককটেল বানান হচ্ছিল, কেউ দরজা খোলায় প্রচন্ড বাতাসে ককটেল পড়ে ব্লাস্ট করেছে।
বারুদের গন্ধ আর সহ্য হচ্ছিলো না, নীচে নেমে এলাম। আগামীকাল হরতাল ডেকেছে, এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। নীচে মানুষ গিজগিজ করছে, হলের হাউজ টিউটর আর প্রোভস্ট স্যার এসেছেন, মিটিং চলছে। এর মাঝেই একটা মিছিল, "এরশাদের চামড়া তুলে নেব আমরা"। কিছুক্ষণ মিছিলের পেছনে হাটলাম। আমার মিছিল করতে ভালই লাগে, এটা যৌবনের উম্মাদনা। আন্দোলন আর দাবী আদায় আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম চলছে।
সন্ধ্যা নাগাদ খবর এল, বাবলু ভাই আর নেই। অন্য আহত ব্যক্তির অবস্থা ভাল না, তবে অনেকে বলছে সে বহিরাগত ছিল।
এবার থমথমে অবস্থা, রাস্তার আলো গুলো কে নিভিয়ে দিয়েছে, গেস্ট রুম অন্ধকার। সামনের দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তায় কোন মানুষ নেই। সবাই ডাইনিং এর দিকে ছুটছে, খেয়ে দেয়ে উপরে চলে এলাম। শুনশান নীরবতা।
চারতলা থেকে দেখি দোতালার ছাদের বিভিন্ন জায়গায় কেউ কেউ অবস্থান নিয়েছে, আবছা আলোয় বোঝা যায় হাতে অস্ত্র। ঘন্টা খানেক পার হয় নি, হঠাৎ কাটা রাইফেল এর গুলির প্রচন্ড আওয়াজে সব নীরবতা খান খান হয়ে গেল। তারপরই দূরে অন্যকোন হল থেকে আবার দু রাঊন্ড গুলির শব্দ। আমরা জিয়ার রুমে আলো নিভিয়ে বসে আছি, আজ কি হবে কে জানে। উত্তেজনায় কারো মুখে কথা নেই, মাঝে মাঝে গুলির শব্দ ভেসে আসছে, নীচে কেউ চিৎকার দিয়ে উঠল, "গেটে তালা দে"। হল আক্রমণ হতে পারে, না হলে পুলিশ রেইড দিতে পারে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি, দু'টা বাজে। রুমে ফিরে এলাম, চোখ ভার। বিছানায় শুতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছি কে জানে।
হঠাৎ দরজায় কেউ জোরে জোরে আঘাত করছে, দরজা খুলে দেখি জিয়া, শামীম আর হাবিব।
- কি রে ঘুমাস, ওদিকে তো খবর হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি প্যান্ট পড়।
ঘড়িতে তখনও সাতটা বাজে নি, জিন্স প্যান্ট, টি-শার্ট আর কেডস পড়ে ওদের সাথে রওয়ানা দিলাম। অনেক শব্দ চারদিকে। ভাঙচুরের আওয়াজ পাচ্ছি।
বাবলুর মৃত্যু শোক থেকে শক্তিতে পরিনত হল, সেই সাথে রাজনৈতিক অঙ্গনে নীরু, ভাইকে হারিয়ে একা হয়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ে নীরু-বাবলু নাম আর থাকলো না। ছাত্র রাজনীতিতে বাবলুর অবদান ছিল অপরিসীম।
হল থেকে বের হতেই এক অভূতপূর্ব দৃশ্য সামনে ভেসে উঠল। হাজার হাজার মানুষ, হাতে লাঠি, হকস্টিক আবার কারো হাতে অস্ত্র দেখতে পেলাম। সব হলের ছাত্ররা ঝাপিয়ে পড়েছে, নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের ছেলেদের খুঁজছে। কিন্তু আজ ক্যাম্পাসে তাদের কারো টিকিটি খুঁজে পাওয়া গেল না। মিছিলে মিছিলে স্লোগান, ক্যাম্পাস প্রকম্পিত হচ্ছে, সবাই ছুটছে আর ছুটছে। আমরাও সেই ভীড়ে হারিয়ে গেলাম।
এইদিন নতুন বাংলা সমাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে চিরতরে বিদায় হল।
☀
(গল্পের প্রয়োজনে কিছু নাম এসেছে, এটুকু মার্জনা করলে বাধিত হব)।
#পর্ব_৫
----- গল্পের চরিত্রগুলো কাল্পনিক --------
জানুয়ারি ১৯৮৭
ঢাকা
সুপ্রিয়া,
কেমন আছো? জন্মদিনে সুন্দর বই উপহার দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। বিমল করের অসময় আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গভীর গোপন, দুটোই অসাধারণ লেগেছে। এর আগে বিমল করের কোন বই পড়িনি, লেখার ধরণটা ভিন্ন। ছোট বেলা থেকে বই পড়ার অভ্যাস, যা পেতাম তাই পড়তাম, যেমন কুয়াশা, দস্যু বনহুর, দস্যু পাঞ্জা, মাসুদ রানা। তারপর শরৎ চন্দ্র, কিরিটি রায় আরো কত কি। ঠাকুর মার ঝুলি আর আরব্য রজনীও বেশ লাগত।
তুমি অনেক বই পড়, তাই না। শুনলাম তোমার সংগ্রহে অনেক বই আছে। ভাল হল, তুমি ঢাকা এলে তোমার কাছ থেকে বই নিয়ে পড়া যাবে, গাটের টাকা খরচ করতে হবে না।
গভীর গোপন বইটা পড়তে পড়তে আমি এতটাই ডুবে ছিলাম, মনে হল আমি ছোট বেলায় হারিয়ে যাচ্ছি। আমার ছোট বেলার কিছু কথা বলি।
আমাদের বাড়ির পুকুর পাড়ে কাঠ বাদামের একটা গাছ ছিল, বাড়ীর পেছনে মস্ত বড় একটা বাগান, আসলে ভুল বললাম, বাগান না বলে জঙ্গল বলাই ভাল, সেথানে একটা বেল গাছ ছিল, ভর দুপুরে যেতে ভয় পেতাম। কাজের লোকদের টাট্টি খানাটা ওখানেই। ওদের বড্ড সাহস।
বন্ধের দিন, পুকুরে নামা চাই ই চাই, সাতার জানি না, তাতে কি, কলা গাছ নিয়েই নামতে হবে। এ মাথা থেকে ও মাথা, সাবমেরিন চালাতাম। উঠতে ইচ্ছেই হত না। কলা গাছের ডগা দিয়ে দারুন বন্দুক হত, মাঝে মাঝে ফালি কেটে, হাত দিয়ে টান দিলেই, ফটাফট শব্দ। একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব ছিল। পেছনের ফলসা গাছটা আমি আর কোথাও দেখি নি, ছোট ছোট ফল, পাকলে বেগুনী হয়ে যেত। তার পাশে একটা পেয়ারা গাছ ও চালতা গাছ। সন্ধ্যে হলে ওখানে অনেক ডাহুক আসত। বাড়ীর নীচে একটা সুরঙ্গ ছিল, তার মধ্য থেকে বেজী আর গুই সাপ বের হত। একবার একটা দাশবাঘও দেখেছি। পেয়ারা গাছের নীচে একটা কুয়া ছিল, আগে হয়ত কূয়া থেকে পানি তোলা হত। মূল বাড়ী থেকে রান্না ঘর আলাদা ছিল।
১৯৭১ সালের আগের স্মৃতি আমার কাছে অনেকটাই অস্পষ্ট, বয়স তখন ৬ বছর হবে, তবে দেশ স্বাধীনের পরের কথাই বেশী মনে পড়ে। হঠাৎ বাজারে চালের আকাল হল, আমাদের বাসায় ছিল মেহের আলী বাবুর্চী, আমরা দাদা বলে ডাকতাম। খুঁজে টুজে লঞ্চ ঘাটের আড়ত থেকে এক বস্তা চাল নিয়ে্ এল, সবাই খুশী, পাওয়া গেল তাহলে। ভিখারীরা এলে ভাত চাইত না, শুধু মাড়ের জন্য বায়না করত। অভাবটা আসলেই বড় কষ্টের। থাক সেকথা।
বসন্ত আর শীতকালে খুব ঘুড়ি উড়াতাম। আমাদের বাসার সামনে বিরাট মাঠ ছিল, আম্মার ভয়ে মাঝে মাঝে ঘূড়ি ও নাটাই সিমা আপাদের বাসায় রাখে আসতাম। আমাদের পাশেই ছিল ওনাদের বাসা। ঘুড়ি বক্কাটা হলে, ওর পেছনে ছুটতাম।
আজ সবই স্মৃতি।
তোমার চিঠির প্রতিক্ষায় রইলাম।
🍂
সুহৃদ
#পর্ব_৬
(বিঃদ্রঃ গল্পের চরিত্রগুলো কাল্পনিক, আর লেখাটি ইতিপূর্বে "অলেখা কাব্য" নামে প্রকাশিত হয়েছে)
লঞ্চের ডেকে চাদর বিছিয়ে গিয়েছি সেই সকাল বেলা, বিকেল ৫-০০ টা বাজতেই ভিড় সামলানো দায়, লঞ্চ ছাড়বে সন্ধ্যা ৬-০০ টায়। মানুষের ভিড় ঠেলে কোন রকম জায়গামত এসে দেখি চাদর আছে, তবে দু'জনের জায়গা ঠেলে যথারীতি একজন করা হয়েছে। কিছুটা বাদ প্রতিবাদে কিঞ্চিৎ জায়গা ফেরত পাওয়া গেল, আমি আর প্রিন্স ব্যাগ রেখে বসে পরলাম। অল্প পয়সায় বরিশাল থেকে ঢাকা যাতায়াতে আমাদের ডেকই ভরসা। রাতটা কোন রকম ঘুমিয়ে কাটাবো, তারপর ভোর হলেই ঢাকা।
মাসের ৬ তারিখ, হাত একেবারেই শুন্য, টিউশনির টাকাটা এখনো দিল না, চাইতে লজ্জা লাগে, একবার ভেবেছিলাম বলি, বলা হল না। দোতালার সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এসেছি, পেছনে থেকে ডাক। স্যার শুনেন, ঘুরে দেখি আমার ছাত্রের পিচ্চি ভাইটার হাতে খাম। মনটা ভরে গেল। হাত বাড়িয়ে খামটা নিয়ে পকেটে পুরলাম। হলে এসে খামটা বের করলাম, টাকাটা গুনে দেখি, কম হলেও কি কিছু বলতে পারবো। কিন্তু খটকা লাগল, খামটা অন্য রকম, বেশ দামী, আর মুখ খুলতেই একটা পারফিউম এর গন্ধ নাকে লাগল, সুন্দর মেয়েলী হাল্কা সুবাস। খামের ভেতর কোন টাকা নেই, একটা চিঠি। এ মূহুর্তে হাসব, না কাঁদব। ক্ষুধার্ত উদর, প্রেমের কবিতা কি বোঝে। আমার নিয়তি সব সময় আমার সাথে রসিকতা করে।
যাই হোক চিঠিটা পড়তেই হল। কোন সম্মধন নেই। গোটা গোটা হাতে যা লেখা, তাতে ভাল লাগার বিষয়টার বিশদ বর্ননা। এখন মনে পড়লো, বাসায় ঢুকতে সেদিন টেবিলে বসা একটি মেয়েকে দেখেছিলাম। বয়স ১৭-১৮ হবে। ফর্সা না বলে উজ্জ্বল শ্যামলা বলা যায়। দু তিন দিন দেখেছি, আগে দেখিনি, হয়ত বেড়াতে এসেছে। হুট করে প্রেম নিবেদন।
বেশ ক্ষিদে পেয়েছে, কাপড় বদলিয়ে নীচে নেমে এলাম। হলে ডাইনিং এর খাবার নয়টার পর একেবারে ঠান্ডা হয়ে যায়, খেতে বিস্বাদ লাগে, আজ আবার পেপে দিয়ে চীতল মাছ রান্না করেছে। পেপে আমার খুবই অপছন্দ। চীতল মাছ মনে হয়, মেশিন দিয়ে কেটেছে, এত পাতলা, হাত দিয়ে কাটা সম্ভব বলে মনে হয় না। একদিন আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্যার, তার স্মৃতি চারণে বলেছিলেন, ওদের মাছ কাটা শিল্পের পর্যায় পড়ে। ভাত খেয়ে, আমীরের দোকানে গিয়ে চা খাবো, কাল পরীক্ষা, রাত জেগে পড়তে হবে। রুমে ফিরে এলাম, একটু পরেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ, খুলতেই মুখস্ত বানী। মিছিল আছে নীচে আসেন। না গেলে আবার চিহ্নিত হয়ে যাব। এই হল হলের জীবন।
নীচে আমার বন্ধুরাসহ আরো অনেকে, বেশ শ্লোগান শোনা গেল, ওমুকের চামড়া তুলে নেব আমরা। চামড়া তোলা তুলি শেষ হলে, রুমে এসে ঘুম দিলাম। পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখা যাবে।
পরীক্ষা শেষ করে হলের উদ্দেশ্যে বেড় হলাম, রুবির সাথে দেখা, এই ছেলে পরীক্ষা কেমন হল।
- কেমন আবার ভাল, না পড়ে পরীক্ষা দিলে পরীক্ষা ভালই হয়।
- বন্ধু তোমার কোন কাজ না থাকলে আমার সাথে, একটু নীলক্ষেত যেতে পারবা।
- অবশ্যই, তবে বাকু শাহ মার্কেটে, সিংগারা খাওয়াতে হবে।
একটা রিক্সা নিয়ে রুবির সাথে হাওয়া খেতে খেতে নীলক্ষেত যাচ্ছি, রুবির চুলগুলো এসে মুখে ঝাপটা দিচ্ছে, আর ও বারবার সরাচ্ছে, বলল sorry।
মনে মনে বলি, sorry কেন আমারতো ভালই লাগছে।
সূর্য সেন হল পার হয়ে মহসীন হলের দিকে যাব, ঠিক তখনই আকাশ কাপিয়ে গুলির আওয়াজ, নিশ্চয় কাটা রাইফেল। জহুরুল হক হলের দিক থেকে গুলি আসছে। আবার শুরু যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। একটু গোলাগুলি কমতেই, এক দৌড়ে রাস্তাটুকু পার হলাম জীবন বাজী রেখে।
হলের জীবন রাজনৈতিক বেড়াজালে আবৃত। আর তার মাঝে দু'একটা মধুর স্মৃতি নাড়া দিয়ে যায়।
🌹
#পর্ব_৭
ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল খেলা চলছে, রাত ১১-০০ টা বাজলেই সবাই টিভি রুমে চলে যায়, হলে তখন সুনসান নিরবতা। খেলা দেখার প্রতি আগ্রহ আমার বরাবরই কম, তার উপর নতুন এক টিউশনি পেয়েছি। আমার বন্ধু পবন গুলশানে এই টিউশনি জোগাড় করে দিয়েছে। বাংলা মাধ্যমের ছেলেদের পড়ালে ৪০০ টাকার বেশি দেয় না, এটা ইংরেজি মাধ্যম, ও লেভেলের একাউন্টিং পড়াব, এখানে ২,০০০ টাকা পাব। সারা মাসের খরচ উঠে যাবে। প্রথমে একটু ভয়েই ছিলাম, কারণ আমার ইংরেজি জ্ঞান তথৈবচ। ওদের সাথে যদি ইংরেজিতে কথা বলতে হয়, তাহলে তোতলানো ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু প্রথম দিন পড়াতে গিয়ে ভূল ভাংলো, ছেলেটা অসম্ভব ভদ্র, ইংরেজি মাধ্যম এর ছেলেদের সম্পর্কে যে ধারণা ছিল, তা মুহুর্তে বিলীন হয়ে গেল। আর হ্যাঁ, বাংলা ভাল বলে, তাই আলাপচারিতায় কোন সমস্যা হচ্ছে না।
যেহেতু নতুন টিউশনি, তার উপর ইংরেজি মাধ্যম, তাই জ্ঞানটা ঝালাই করার জন্যে বই নিয়ে বসলাম। ঘড়িতে তখন রাত ১২-০০ টা পার হয়ে গেছে। টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়তে বসলাম, বড় আলোটা নিভিয়ে দিয়েছি। অন্যান্য রুমগুলোতেও অন্ধকার, সবাই নীচে খেলা দেখছে। আশেপাশে কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না, দূরে একটা রুমে আলো জ্বলছে।
পড়ায় এতটা মশগুল ছিলাম, যে কোন দিকেই খেয়াল ছিল না। হঠাৎ মেয়েলী কন্ঠ কানে যেতেই শরীরটা শিউরে উঠল। হলে মেয়ে আসবে কোত্থেকে, তাও এত রাতে। রুমে একা, হলে কারো সাড়া শব্দ নেই, আবার জ্বীন-ভূত এর পাল্লায় পড়লাম নাকি। শির দাড়া বরাবর একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল, উঠতে চাচ্ছি, কিন্তু শরীরটা ভার মনে হচ্ছে। এভাবে বসে থাকা ঠিক না। দরজার কাছে তালা-চাবি আছে। দম বন্ধ করে, এক লাফে দরজা খুলে বাইরে। কিন্তু যা দেখলাম, তার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না, হাসিও পাচ্ছিল। আমাদের হলে রুমে রান্নার জন্যে অনেকে পিচ্চিদের রাখে, এই ছেলেদের বয়স ১০-১২ বছর, ভাল রান্না জানে, সব কাজ করে। এদের কন্ঠস্বর মেয়েদের মত, আর রাতে হঠাৎ শুনলে মনে হয়, কোন মেয়ে কথা বলছে। যাক ভয়টা কেটে গেল। দরজায় তালা দিয়ে নীচে নেমে এলাম।
এই ভুতের ভয় পাওয়ার কারণ আছে, মাস খানেক আগে সারাহ আপার সাথে তার বান্ধবী সুইটি আপার বিয়েতে হলুদের আলপনা করতে গিয়ে ছিলাম। তার আগে ওনার বড় ভাইয়ের হলুদের আলপনাও আমার করা। সে কারণে ওই বাসায় স্বাচ্ছন্দ ছিল, আর ওনাদের চমৎকার ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে। ধানমন্ডিতে সামনে লনসহ দোতলা বাসা। রাত প্রায় বারোটা বাজে, নীচের বারান্দায় আলপনা করছি, সাথে সারাহ আপা, সুইটি আপা, ওনার ভাবী আর তার ছোট বোন। হঠাৎ আন্টি উপর থেকে ছুটে এলেন।
- এই হয়েছে, তোমরা উপরে যাও, বাকি কাজ কাল সকালে। অল্প কাজ ছিল, ছেড়ে যেতে মন চাইছে না, কিন্তু আন্টি নাছোড়বান্দা। যেতেই হল, উপরে এসে সুইটি আপাকে জিজ্ঞেস করলাম, বিষয় কি। আন্টি যে জোর করে নিয়ে এল। উনি হেসে বললেন, রাত বারোটার পর ওনারা এখানে চলাচল করেন।
- ওনারা মানে? কে চলাচল করে।
- আমরা যাদের দেখতে পাই না।
তারপরের গল্পটা এরকম।
নীচে একজন গার্ড ছিল। একদিন রাতে তাকে মৃত পাওয়া যায়, চৌবাচ্চায় মাথা ডোবানো ছিল, রাতের বেলা, অনেকে দেখেছে, দেয়ালে বড় দা হাতে লোক বসা, মুখ দেখা যায় নি। এর সাথে ভাবী যোগ করেন, পাপ্পু ভাই কাজে ঢাকার বাইরে গিয়েছেন, ভাবী বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন, মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে দেখেন, সব বাতি জ্ব্বলছে, কেউ হয়ত জ্বালিয়ে গেছে, নিভাতে মনে নেই। বাতিগুলো আবার নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, বাথরুমের বাতি জ্বলছে, আর মনে হল, কেউ কল ছেড়ে পা ধুয়েছে, কিছু মাটির দাগ। উনি শাশুড়ীকে জানালেন, তিনি বললেন ভয় পেয় না, সব জায়গায় তাবিজ ঝুলানো আছে, আর আমাদের কারো ক্ষতি করে নি।
ওনাদের এই ভুতের গল্প শুনে সেদিন রাতে ফেরত আসি, গল্প সত্য না মিথ্যা জানার উপায় নেই, কিন্তু এরকম জ্বীনের গল্প বা সংস্পর্শে আসার সুযোগ বহুবার হয়েছে। সেরকম আরেকটি গল্প আমার ছোট বেলার।
আগেই বলেছি, আমাদের বাসা প্রায় এক একর জমির উপর ছিল, কিছুটা আমাদের আর বাকিটা শরীকদের। ব্রিটিশদের বানান বাড়ি, অনেক উঁচু ছাদ, আর বেশ বড় বড় কক্ষ। রান্না ঘর, মুল দালানের লাগোয়া, আলাদা করে করা। রান্না ঘরের পেছনে জংগল। সেখানে পেয়ারা, চালতা, কাঠাল, আম, আতাফল, ফলসা, কলাসহ অসংখ্য গাছ। রাতের আঁধারে ভৌতিক অবস্থা। কাজের লোকদের টাট্টিখানা ঐ দিকে, জংগলের মাঝে, বেল গাছের নীচে। পাশেই পুকুর পাড়ে বাঁশ ঝাড়।
আমাদের ছিল যৌথ পরিবার। মেঝ চাচা সদ্য বিয়ে করেছেন, আর তাদের কোল জুড়ে এসেছে ফুটফুটে মেয়ে। চাচীর ছোট বোন এসেছেন ঢাকা থেকে বেড়াতে। আমার বয়স তখন ৭ - ৮ বছর, ভাইয়া আমার ৩ বছরের বড়। তারই মাঝে একদিন, মাগরিব নামাজের পর হঠাৎ শোরগোল শোনা গেল, ড্রয়িং রুমের পাশেই আমাদের মেহের আলী বাবুর্চি থাকতেন। আমরা দাদা বলে ডাকতাম। হই চই টা ওদিক থেকেই। আমি আর ভাইয়া ছুটে গেলাম, কি হল? আম্মা, চাচী, খালা সবাই এসেছন।
চাচীর ১০ - ১২ বছরের কাজের মেয়ে রেজিয়া, দাদার বিছানায় অজ্ঞান, দাত কিরমির করছে, নুরী বুয়া খুন্তি দিয়ে দাত কপাটি খোলার চেষ্টা করছে, দাদা সেন্ডেল নাকে শোকাচ্ছে, কিন্তু না কোন গ্রাম্য চিকিৎসাতেই কাজ হচ্ছে না। রেজিয়া ঘামে একাকার, কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম, শরীর পাথর হয়ে আছে, গোংরানি শুরু করল, তারপর হটাৎ শরীর মোচড় দিয়ে, কথা বলে উঠলো।
- এই পশ্চিম দিক ছাড়।
এত রেজিয়ার কন্ঠ না, ভারী পুরুষালি বৃদ্ধ লোকের কন্ঠ, আমরা দু ভাই ভয়ে কেঁপে উঠলাম, আম্মা চিৎকার দিয়ে খালাকে বলল, ওদের নিয়ে শোয়ার ঘরে যাও। আমরা শোয়ার ঘরে এসে বিছানায় চড়ে বসলাম, মনে হল পা ঝুলিয়ে বসলে, খাটের নীচে থেকে পা ধরে টান দিবে। চাচীর পাশের ঘরে, পার্টিশন দেয়া মেয়েদের নামাজের ব্যবস্থা, তবে অনেক বছর, ঐ ঘরে কেউ ফজরের নামাজ পড়ে না, শোনা যায় আগে জ্বীন পরী তাহাজ্জুদ পড়তে আসতো।
অবস্থা বেগতিক, আম্মা আর চাচী রুমে ফিরে এসেছে, মেঝ চাচাকে খবর দিতে হবে, সামনের রাস্তার ওপারে আলফা - লীজদের বাসা। ওখান থেকে ফোনে মেঝ চাচাকে বরিশাল ক্লাবে জানাব। দাদা আর আমরা দুই ভাই বাসা থেকে বেড় হলাম, হাতে টর্চ, আলোও কম, দুই দিকে তাকানো যাচ্ছে না, ঘুটঘুটে অন্ধকার, আগে ভয় পাই নাই। আজ ভয় করছে। পথ শেষই হয় না।
আমার মেঝ চাচা ওনার পিয়ন, কালু ভাইকে নিয়ে এসেছে, উনি জ্বিন ভূত বিশ্বাস করেন না, আব্বাও এগুলো বিশ্বাস করেন না। কালু ভাই দ্বায়িত্ব নিলেন, আমবাগান থেকে এক মুরুব্বি নিয়ে এসেছেন, যিনি জ্বীন-ভূত তাড়াতে পারেন। আমরা ভয় ভয়ে ঘুমিয়ে পরেছি। সকালে শুনলাম উনি, ওনেক দোয়া দরূদ পড়ে, তাবিজ দিয়েছেন, আর তাতেই কাজ হয়েছে। রেজিয়ার উপর অনেক ধকল গিয়েছে।
আমরা বারান্দায় বসে গল্প করছি, নূরী বুয়া এসে টুলে বসল। চাচী বলতে শুরু করলেন।
গতকাল দুপুরে, খাবার পর রেজিয়াকে ডাকাডাকি করেও পাচ্ছিলাম না, সামনের বারান্দায় খুজতে এসে দেখি, রেজিয়া বাগানের সেই বড় আম গাছটায় অনেক উপরের ডালে ঊঠে কি যেন করছে। এত উপরের ডালে উঠলো কি করে বুঝলাম না। জোরে ধমক দিলাম, এই পড়ে যাবি। নাম নীচে, নাম বলছি। একটু পর তরতর করে নীচে নেমে এলো, আর আমার দিকে কেমন কটমট করে তাকিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল। মনে হল, আমার কথা পাত্তাই দিচ্ছে না।
রেজিয়া সপ্তাহ খানেক পর সুস্থ হল, দুপুরে ভাত খাবার পর চালতা মাখানো আচার নিয়ে বসেছি, চাচী দারুণ করে কাচা চালতা মাখান। চাচী রেজিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন।
এই তোর কি হয়েছিল, বলতো।
রেজিয়া চুপ, বেশ কিছুক্ষণ পর বলতে শুরু করল।
- কয় দিন আগে বিকালে টাট্টিখানায় গেছি, বের হইছি আর সামনে দেখি কতগুলা কুত্তা, মাথা ছাগলের মত। মোরে দেইখা হাসছে আর তাইর ফর, বাশঝাড় পার হইয়া পুষ্কুনীর দিক চইলা গেছে। জংগলের মধ্যে এই বেল তলায় গেলেই আমার কেমন জানি লাগে। মনে হয়, কে জানি আছে। মোরে ডাকে।
আমাদের বাসায় সমস্যা ছিল, কিন্তু আমরা সামনাসামনি কিছু দেখি নি। তাই সত্য মিথ্যা বলা দুরূহ। তাই, রাত হলে মেয়েলি কন্ঠ শুনলে মনেই হতে পারে, অদেখা কিছু আছে। আর ভয়টা আজও আছে, একা থাকলে মনে হয়, কেউ আছে। যাদের এরকম মনে হয়, তাদের অভিজ্ঞতা জানাবেন। আর অদেখা ভুবন অদেখা থাক, সেই কামনা করি।
[যারা আমার লেখা পড়েন তাদের অনুরোধে এই লেখা একটু বড় করলাম, আর এই লেখা আমার জীবনের সত্য কাহিনী, তাই চরিত্রগুলো কাল্পনিক, এটা বলা ঠিক হবে না। যাদের নাম এসেছে, তাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি, অনুমতি না নিয়ে প্রকাশ করার জন্য]
🌵
© ˢʰᵃᶠᑫᵃᵗ ʳᵃᵇᵇⁱ
© ˢʰᵃᶠᑫᵃᵗ ʳᵃᵇᵇⁱ

খুব ভালো লাগলো।
ReplyDeleteস্যার, আপনি অনেক সুন্দর লিখেন।
ReplyDeleteভালো লাগলো।
লেখা পড়তে পড়তে মিস্টি মধুর হলের স্মৃতিচারণ করছিলাম, যদিও আপনার হল লাইফ টা কেটেছে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায়। সত্যি বলতে লেখাটা জীবন্ত। অনেক ভালো লেগেছে।
ReplyDelete