স্মৃতির পাতায় রুম নং - ৪৪৯
সামান্যই
লাগেজ, লাগেজ বললে হয়তঃ ভূলই হবে। একটা মাত্র ব্যাগ। তাই নিয়ে ফুপুর বাসা
ধানমন্ডি থেকে রওয়ানা হলাম মহসিন হলের উদ্দেশ্যে। মনটা কেমন জানি একটু
খরখরে লাগছে, শব্দটা ঠিক হল না। এটা কি ভয়, প্রথম দিন কি হবে, কেমন যাবে।
কিবরিয়া ভাই অবশ্য বলে ছিলেন, সমস্যা নেই - চলে এসো। মাহবুবেরও আসার কথা।
ভাবনা
শেষ হতেই রিক্সাটা পৌছে গেল, মহসিন হলের গেটে, ৪ টাকা ভাড়া দিয়ে নেমে
গেলাম। একজনকে জিজ্ঞেস করে ৩য় তলায় চলে এলাম, কিবরিয়া ভাই রুমেই ছিলেন।
মাহবুবও পৌছে গেল। আমাদের ঠাই হ’ল একটা সিংগেল রুমে। তবে এটা বেশী দিন
স্থায়ী হয়নি, কারণ রুমের মালিক আসতেই আমাদের অন্যত্র ব্যবস্থা করার চেষ্টা
হল। এবার মাহবুব চলে গেল আরেক রুমে, আার আমার ঠাই হ’ল ৪৪৯ এ।
ছাত্রদলের
দুই বড় ভাই (ছাত্র নেতা) মিলে রুম ভাগ করার দায়িত্ব পালন করেন। কারণ,
প্রায় সব রূমেই বিএনপির লিষ্টে। পার্টি না করলে রুম নেই [সীট রাজনীতি সব
হলে একই রকম ছিল, যেমন জহুরুল হক হল, ছাত্রলীগের]। আমি যে কোন পার্টি করতাম
তা আমারই জানা ছিল না। হয়ে গেলাম বিএনপির একনিষ্ঠ কর্মী। রুম মেট হিসেবে
পেলাম শাহীন ভাইকে, উনি আমাদের বরিশাল এর কৃতী সন্তান, পড়েন ইংরেজী
সাহিত্যে, স্বাভাবিকভাবেই কারণে অকারণে ইংরেজী বলার চেষ্টা। আমার বিদ্যা
অবশ্য “দ্যাটস রাইট” পর্যায়ে। যাক রুম মেট ভাল পাওয়া গেল। ক্লাসও শুরু
হ’ল, কুমিল্লার কিছু বন্ধু জুটে গেল (জিয়া, শামীম, হাবিব ও হুমায়ুন)। আমি
প্রসঙ্গান্তরে যেতে চাই না, ফিরে আসি হলের কথায়। বাবা রিটায়ারমেন্ট এ
যাওয়ায় আমার আর্থিক অবস্থা সঙ্গীন, মাসে মাত্র ৫০০ টাকা আম্মা কষ্ট করে
পাঠাত, হিসেব করে চলা। ৫.৫০ টাকা করে টিকেট কেটে দু’বেলা ডািইনিং হলে, আর
৩.১৫ টাকায় পাটওয়ারীর ক্যান্টিনে সকালের নাস্তা। এতেই চলে যেত ৪২৫ টাকা,
হাতে থাকে আর সামান্য। কঠিন সংগ্রাম। শরীরের ওজন কমতে থাকল, সব প্যান্ট
ঢিলে হয়ে যাচ্ছে, প্যান্ট কেনার তো পয়সা নেই। ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছি। একটা
বিষয় খেয়াল করলাম, আমার ঢাকার সহপাঠি / সহপাঠিনীরা কেমন যেন একটু এড়িয়ে
যায়, এটাকে কি বলে পাত্তা না দেয়া। তবে সোমা ছিল ভিন্ন, অসম্ভব ভাল একটা
মেয়ে (অবশ্য আমার চোখে সব মেয়েরাই ভাল)।
যাক ভাবার সময় নেই, একটা আয়ের পথ খুজতে হবে। এমন সময় স্বর্গ খেকে হাজির হ’ল আমার ছোটবেলার বন্ধু পাপ্পু, রামপুরা্য় ২০০ টাকার একটা টিউশনি জোগার করে দিল,সেতুকে বুককিপিং করাতে হবে। প্রতি দিন বিকেলে টিএসসি তে আড্ডা দেয়ার বদলে চলে যেতাম ছাত্র পড়াতে।
যাক ভাবার সময় নেই, একটা আয়ের পথ খুজতে হবে। এমন সময় স্বর্গ খেকে হাজির হ’ল আমার ছোটবেলার বন্ধু পাপ্পু, রামপুরা্য় ২০০ টাকার একটা টিউশনি জোগার করে দিল,সেতুকে বুককিপিং করাতে হবে। প্রতি দিন বিকেলে টিএসসি তে আড্ডা দেয়ার বদলে চলে যেতাম ছাত্র পড়াতে।
এর
মাঝে উটকো এক ঝামেলা জুটলো, আরেক ক্যাডার ভাই (ছাত্র নেতা) আমাকে ডেকে
বলল, আমার সীটে আমার সাথে আরেকটা ছেলে থাকবে (অছাত্র), একটু সমস্যায় পড়েছে
তাই। প্রায় ৬ মাস ৪ ফিট চওড়া খাটে সোজা হয়ে ঘুমালাম, পরে জেনেছিলাম ছেলেটা
এক মার্ডার কেসের আসামী, পালিয়ে ছিল মহসিন হলে। কিছু দিন একটু আরাম করে
ঘুমাচ্ছিলাম, তারপর আসল আরেক বড় ভাই (ছাত্র নতা) এর অনুরোধ?? আরেকজন আমার
সাথে থাকবে, তার সীট জোগার না হওয়া পর্যন্ত। হায়! শান্তির মা কি সত্যই মরলো
নাকি। যাক দিনতো কেটে যাচ্ছে।
দুপুরে
ঘুমাচ্ছিলাম, হঠাৎ প্রচন্ড শব্দে হুড়মূড় করে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম, কোন
দিকে যাবো, কি করবো বুঝতে পারছিলাম না, রুমের বাইরে আসতে দেখলাম দখিন দিকের
বারান্দায় ছেলেদের ছোটাছুটি, কিছুক্ষন পর আমার সামনে দিয়ে দুজন একটা লোককে
চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাচ্ছে, শরীর থেকে টপটপ করে রক্ত পরছে, চুলে মনে হল
কেউ সাদা পাইডার ছড়িয়েছে, একটু ভাল করে তাকাতে দেখলাম বাবলু ভাই (নীরু
ভাইর বড় ভাই)। রুমে ককটেল বিস্ফোরণে এই অবস্থা, পরে বাবলু ভাই হসপিটালেই
মারা যান।
শীতের
দিনের রাতে লেপের ওম পেলে ঘুমটা মন্দ হয় না। রাত তখনও শেষ হয় নি, হঠাৎ
অনেকগুলো বুটের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল, শুনি লোকগুলো বলছে, ৪৪৯ এই দিকে। শাহীন
ভাই বলল যাও, দরজাটা খুলে দাও। চার পাচজন পুলিশ ঢুকল রুমে। তন্নতন্ন করে
খুজেলো, রুমে কোন অবৈধ অস্ত্র আছে কিনা। কারণটা হল, আমার এক বন্ধু (নামটা
দিলাম না, সেও ম্যানেজমেন্ট এ পড়ত) ক্যাডার ছিল, আমার রুমে প্রায়ই আসত।
ওদের চর ভেবেছিল, আমার রুমে হয়তো অস্ত্র লুকিয়ে রাখে। যাকা কিছু না পেয়ে,
বিমর্ষ বদনে বের হয়ে গেল।
সেদিন
হঠাৎ ফেসবুকে এক ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেলাম, আবার স্মৃতি হাতরে ফেরা, ওর নাম
রুবেল। বেশ ভাল কার্টুন আঁকত, ও কার্টুনের একটা লিটল ম্যাগাজিন বের
করেছিল, নাম ককটেল। এরশাদ বিরোধী দারুন সব কার্টুন, দু’টাকা করে দাম ছিল।
বই মেলায় বিক্রি করতে গেলাম, মূহুর্তে শেষ। হাতে একটা ছেড়া কপি ছিল, এক
ভদ্রলোক জোড় করে ওটাও কিনে নিল। যে রাতে হলে পুলিশ রেইড দিল, ওর রুমে গিয়ে
চিৎকার, স্যার .. স্যার .. অনেকগুলা ককটেল পাইছি, স্যার দৌড়ে এসে বলে ককটেল
কই? এতো পত্রিকা।
অনেক
স্মৃতি, কিন্তু স্থান সংকুলান হবে না, ইতি টানছি। যেদিন ৪৪৯ নম্বর রুম
থেকে সিংগেল রুমে চলে গেলাম, সেদিন হয়তো চোখটা ভিজে গিয়েছিল, কে জানে।
ইচ্ছে করে অনেকের নাম দিলাম না, কারণ কাউকে ছোট করা আমার উদ্দেশ্য নয়।
ইচ্ছে করে অনেকের নাম দিলাম না, কারণ কাউকে ছোট করা আমার উদ্দেশ্য নয়।
[শেষ]

This comment has been removed by the author.
ReplyDeleteGolden memories
ReplyDelete