ইতি


১.

ভোরের লাল আভাটা এখনও কাটে নি, ইতি হাল্কা পায়ে উঠোনের দক্ষিন প্রান্তে এসে দাঁড়ায়। কাল রাতে একটা ভয়ানক স্বপ্ন দেখেছে, ইদানীং প্রায় রাতেই এরকম স্বপ্ন দেখে। রাতে ভয় পেলেও বাবাকে ডাকতে পারে না, বাবা নতুন মাকে নিয়ে পাশের ঘরে ছিটকিনি দিয়ে শুয়ে ছিল।

তুলশী গাছটায় শিশিরের বিন্দু বিন্দু জল জমে আছে, একটু ঠোটে লাগালে ভাল লাগবে। হাল্কা শীত পড়েছে, কিছুটা কুয়াশার চাদর, রোদের আচ টুকু ভাল লাগে। পাশের বাড়ীর বিড়ালটা উঠোনে এসে হামাগুরি দিচ্ছে। একটু আদর করে ডাকতেই, পায়ের কাছে এসে শুয়ে পড়ল, আদর পেতে চায়। যেমন ইতিও চায়, কিন্তু আদর করার কেউ নেই। মা থাকতে ইতির অন্য এক জগত ছিল। সকাল এর এই সোনা রোদ্দুরে মা চুল বেধে দিত, খুব টাইট করে, মাথায় বেশ করে তেল দিত, তেল এ নাকি চুল বাড়ে। মায়ের গায়ের ওমটা ছিল বড় মধুর। ইচ্ছে হত মায়ের শরীরে ঢুকে যেতে, হাল্কা শীতে কি যে ভাল লাগত। মা আকাশের তারা হয়ে গেছে।

পাশের বাড়ির চাচী এসে বাবাকে বোঝাল পুরুষ মানুষ একা থাকতে নেই, আর ইতির আদর যত্ন করার ও তো লোক দরকার। ব্যস ওনার চাচাতো বোনের সাথে বাবার বিয়ে হয়ে গেল। নতুন মার আগে একটা সংসার ছিল, কি কারণে যেন ভেঙে যায়। ওই ঘরে একটা ছেলে আছে, দাদার সাথে থাকে।

২.
ইতি খাটের এক কোনে জুবু থুবু হয়ে ঘুমাচ্ছিল, হঠাত খাটটা মনে হয় একটু নড়ে উঠল, ইতির ঘুমটা ভেঙে যায়, চাঁদ এর একটু হাল্কা আলো এসে পড়েছে, হাস্না হেনার মত একটা মিষ্টি সুবাস, ওদের বাড়ির কাছে কোন ফুলের গাছ নেই, হঠাত মনে হল, খাটের কোনে কেউ বসে আছে।
একটা ভয়ের স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায়, ইতি আরেকটু আড়ষ্ট হয়ে, বালিশ দিয়ে মুখ ঢাকে, চিৎকার দিতে চায়, গলা দিয়ে আওয়াজ বেড় হয় না, বাবা পাশের ঘরে, নতুন মাকে নিয়ে, ফুলের গন্ধটা কি আরেকটু বাড়ল, খাটের নীচে একটা শব্দ হল।

দেয়ালের টিকটিকিটা একবার ডাক দেয়, শ্বাস ফেলতে ভয় হচ্ছে, যে বসে ছিল, হাল্কা আলোয় মনে হয়েছে, ইতির মতই কেউ। নাকি ভুল দেখলাম। কতক্ষন কেটেছে ইতির মনে নেই, কিছুক্ষন পর আজান শোনা গেল, ইতি মুখের উপর দিয়ে বালিশটা সড়ায়, ঘরে কেউ নেই, গন্ধটাও চলে গেছে। একটু পর আকাশটা পরিষ্কার হয়, পাশের বাড়ির চাপ কলে পানির শব্দ, ক্ষনার মা এসেছে হয়ত, এখন আওয়াজ করে হাড়িপাতিল ধুবে। ইতি উঠে বসে, চোখটা চলে যায়, যেখানে ও রাতে বসা ছিল, বুকটা ধ্বক করে ওঠে, ঠিক ওখানে চাদরটা একটু কুচকান, আর কেউ বসলে, বিছানা যেভাবে চেপে যায়, সেভাবে। ইতি এক লাফে ঘর পার হয়ে, উঠানে চলে আসে। ঠিক ক্ষনার মা হাড়ি পাতিল নিয়ে বসেছে, ইতিকে দেখে বলে কি গো মা, রাতে ঘুম হয় নি, নাকি। মনে হচ্ছে বুকের শব্দটা বুঝি ক্ষনার মা শুনে ফেলবে। ওকে কি বলবে বিষয়টা, বললে বিপদ, ও লম্বা কাহিনী ফাদবে, আর এঘর ওঘর বলবে। হঠাত পেছনে ঝুপ করে শব্দ, ফিরে দেখে বিড়ালটা চাল থেকে ঝাপ দিয়েছে, পায়েরকাছে এসে মাথা ঘষছে। বিড়ালটাকে বললে কেমন হয়, ওতো কাউকে বলবে না।

লাউয়ের মাচাটা পার হলে একটা ছোট পুকুর আছে, আসে পাশের ঝোপ ঝাড়ের কারণে অন্ধকার হয়ে থাকে, সেদিন এই পুকুরপাড়ে একটা বেজী দেখেছি, হয়ত সাপ আছে। পুকুরের দক্ষিনে একটা ছোট বাশ ঝাড়।

৩.

সন্ধ্যার আলো এখনো নেভে নি, ছোট মা উনুন ধরিয়েছে, মাটির বাসনে তিন টুকরো মাছ, তাই রান্না হবে। সন্ধ্যার দিকে আলো ফিকে হয়ে আসে, আর ঝি ঝি পোকার গুঞ্জন বাড়ে। বাবা হাট থেকে ফেরে নি। ঝোপের আড়ালে সড়সড় শব্দ, একটা শেয়াল উঁকি দিল মনে হয়, মাছের গন্ধ পেয়েছে। ফাক পেলেই চুরি করে পালাবে।
সাঝের আলোটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল, রান্না শেষ, ছোট মা থালায় ভাত বেড়ে ইতিকে ডাকল, বাবার জন্যে মা বসে থাকবে, ভাত খেয়ে ইতি কল তলায় গিয়ে ঝুটা বাসন ধুয়ে ফেলে, সে এখন একটু একটু কাজ করে, মা বেচে থাকতে, ইতিকে এসব করতে দিত না।

ঘুমে দু'চোখ লেগে আসছে, কাঁথাটা টেনে ইতি শুয়ে পড়ে। একা ভয় লাগে, কাউকে বলতে পারে না। ঘরেতো আর কেউ নেই, তার পাশে শোবে। কখন ঘুমিয়ে পরেছে খেয়াল নেই, হঠাত একটা সরসর আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে যায়।

খাটের নীচে কেউ ছোট বাক্সটা ধরে টানছে, ওটায় ইতির সংসার, ভালবাসা, স্মৃতি সব। এক আবছায়া মানুষের মত, উবু হয়ে কি যেন দেখছে, ইতি ভয়ে কাঁথাটা মুখের উপর তুলে ফেলে, একটু ফাঁক করে দেখার চেষ্টা। মানুষটা উঠে বসে, দরজার দিকে এগিয়ে যায়। বাইরে এক চিলতে চাঁদের আলো। ঝাপ্সা মানুষটা সেই আলোতে হারিয়ে যায়।

৪.
পশ্চিম পাড়ায় কি যেন হয়েছে, সকাল থেকে হইচই, বাবা তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে যান। মা কলতলায় দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ীর খালার সাথে ফিস্ ফিস করে কথা বলছে।

রানু গাছের সাথে ফাঁস নিয়েছে, রানুর বয়স ১৭। গত বছর বাবার সাথে গিয়েছিলাম পৌষের মেলায়। রানু আপুর সাথে দেখা, খুব মিষ্টি চেহারা, খালি হাসে। হাসিটা এত সুন্দর, ইচ্ছে কিরে গালটা টিপে দেই। গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা, হাল্কা গড়ন। রিণ রিণ করে কথা বলে।

দেখা হতেই বলল -

হ্যারে ইতি, তোদের কুল গাছে কুল হয়েছে? আমাকে দিবি কিন্তু।

আমি মাথা নারি। তুমি এলে আমরা কুল পারব। রানু আপু ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। কিন্তু কেন।

দুপুর নাগাদ পুলিশ এলো, পুরো গ্রাম ভেঙে পরেছে, মানুষ আর মানুষ, রহিম মাতবর পান চিবুতে চিবুতে এগিয়ে যায়। মুখে দাঁড়ি থাকলেও তাকে ভয়ানক দেখা যায়।

- ওসি সাব, মোরা তো আপনার লই বইয়া আছি।

পুলিশ অফিসারটার বয়স কম, তবে চোখে ধার আছে। মাতব্বরের কথায় পাত্তা না দিয়ে, লাশের দিকে এগিয়ে যায়। কিছু লোক জটলা করে, মাতব্বরের ছেলেরে নিয়ে কি যেন বলাবলি করছে।

পেট মোটা এক পুলিশ লাঠি নিয়ে লোক জন তাড়া করছে।

- এই সড় সড়, এই হানে কি মেলা বইছে, যা ভাগ।

রানু যখন স্কুলে যেত, তখন রহিম মাতব্বর এর ছেলে সম্রাট খুবই বিরক্ত করত, ওড়না ধরে টান দিত, আর বাজে বাজে কথা বলত।

৫.
মধ্য রাত হবে, চাঁদের আলো সব ভাসিয়ে দিচ্ছে, উঠানের এক কোনে ইতি চুপ করে বসে, ঘুম আসছে না। কল তলার পেছনে ঝোপ্টা বেশী অন্ধকার। কি যেন একটা চোখে পড়ল, শেয়াল হবে হয়ত, কিন্তু না আবছায়া মানুষের মত, একটু এগিয়ে আসতে, একটা মেয়ের গড়ন, সালোয়ার কামিজ পড়া, ইতির শরীর হঠাৎ জমাট হয়ে যায়, রানু।
       

(চলবে)

Comments

Popular Posts