অলেখা কাব্য


লঞ্চের ডেকে চাদর বিছিয়ে গিয়েছি সেই সকাল বেলা, বিকেল ৫-০০ টা বাজতেই ভীড় সামলানো দায়, লঞ্চ ছাড়বে সন্ধ্যা ৬-০০ টায়। মানুষের ভীড় ঠেলে কোন রকম জায়গামত এসে দেখি চাদর আছে, তবে দু'জনেইর জায়গা ঠেলে যথারীতি একজন করা হয়েছে। কিছুটা বাদ প্রতিবাদে কিঞ্চিৎ জায়গা ফেরত পাওয়া গেল, আমি আর প্রিন্স ব্যাগ রেখে বসে পড়লাম। অল্প পয়সায় বরিশাল থেকে ঢাকা যাতায়াতে আমাদের ডেকই ভরসা। রাতটা কোন রকম ঘুমিয়ে কাটাবো, তারপর ভোর হলেই ঢাকা। 

মাসের ৬ তারিখ, হাত একেবারেই শুন্য, টিউশনির টাকাটা এখনো দিল না, চাইতে লজ্জা লাগে, একবার ভেবেছিলাম বলি, বলা হল না। দোতালার সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এসেছি, পেছনে ডাক। স্যার শুনেন, ঘুরে দেখি ওদের বুয়া হাতে খাম। মনটা ভড়ে গেল। হাত বাড়িয়ে খামটা নিয়ে পকেটে পুরলাম। হলে এসে খামটা বেড় করলাম, টাকাটা গুনে দেখি, কম হলেও কি কিছু বলতে পারবো। কিন্তু খটকা লাগল, খামটা অন্য রকম, বেশ দামী, আর মুখ খুলতেই একটা পারফিউম এর গন্ধ নাকে লাগল, সুন্দর মেয়েলী হাল্কা সুবাস। খামের ভেতর কোন টাকা নেই, একটা চিঠি। এ মূহুর্তে হাসব, না কাঁদব। ক্ষুধার্ত উদর, প্রেমের কবিতা কি বোঝে। আমার নিয়তি সব সময় আমার সাথে রসিকতা করে।
যা হোক চিঠিটা পড়তেই হল। কোন সম্মধন নেই। গোটা গোটা হাতে যা লেখা, তাতে ভালোলাগার বিষয়টার বিশদ বর্ননা। এখন মনে পড়লো, বাসায় ঢুকতে সেদিন টেবিলে বসা একটি মেয়েকে দেখেছিলাম। বয়স ১৭-১৮ হবে। ফর্সা না বলে উজ্জ্বল শ্যামলা বলা যায়। দু তিন দিন দেখেছি, আগে দেখিনি, হয়ত বেড়াতে এসেছে। হুট করে প্রেম নিবেদন।

বেশ ক্ষিদে পেয়েছে, কাপড় বদলিয়ে নীচে নেমে এলাম। হলে ডাইনিং এর খাবার নয়টার পর একেবারে ঠান্ডা হয়ে যায়, খেতে বিস্বাদ লাগে, আজ আবার পেপে দিয়ে চীতল মাছ রান্না করেছে। পেপে আমার খুবই অপছন্দ। চীতল মাছ মনে হয়, মেশিন দিয়ে কেটেছে, এত পাতলা, হাত দিয়ে কাটা সম্ভব বলে মনে হয় না। একদিন আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্যার, তার স্মৃতি চারণে বলেছিলেন, ওদের মাছ কাটা শিল্পের পর্যায় পরে। ভাত খেয়ে, আমীরের দোকানে গিয়ে চা খাবো, কাল পরীক্ষা, রাত জেগে পড়তে হবে। রুমে ফিরে এলাম, একটু পরেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ, খুলতেই মুখস্ত বানী। মিছিল আছে নীচে আসেন। না গেলে আবার চিহ্নিত হয়ে যাব। এই হল হলের জীবন।

নীচে জিয়া, শামীম আরো অনেকে, বেশ শ্লোগান শোনা গেল, ওমুকের চামড়া তুলে নেব আমরা। চামড়া তোলা তুলি শেষ হলে, রুমে এসে ঘুম দিলাম। পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখা যাবে।

পরীক্ষা শেষ করে হলের উদ্দেশ্যে বেড় হলাম, রুবিনার সাথে দেখা, রাব্বি পরীক্ষা কেমন হল। কেমন আবার ভাল, না পড়ে পরীক্ষা দিলে পরীক্ষা ভালই হয়।

- রাব্বি তোমার কোন কাজ না থাকলে আমার সাথে, একটু নীলক্ষেত যেতে পারবা।
- অবশ্যই, তবে বাকু শাহ মার্কেটে, সিংগারা খাওয়াতে হবে।

একটা রিক্সা নিয়ে রুবিনার সাথে হাওয়া খেতে খেতে নীলক্ষেত যাচ্ছি, রুবিনার চুলগুলো এসে মুখে ঝাপটা দিচ্ছে, আর ও বারবার সড়াচ্ছে, বলল সরি।

মনে মনে বলি, সরি কেন আমারতো ভালই লাগছে। রুবিনাকে আমরা সানসিল্ক বলে ডাকতাম।

সূর্য সেন হল পার হয়ে মহসীন হলের দিকে যাব, ঠিক তখনই আকাশ কাপিয়ে গুলির আওয়াজ, নিশ্চয় কাটা রাইফেল। জহুরুল হক হলের দিক থেকে গুলি আসছে। আবার শুরু যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। একটু গোলাগুলি কমতেই, এক দৌড়ে রাস্তাটুকু পার হলাম, জীবন বাজী রেখে।

যতটুকু মনে পড়ে, চিঠির লেখিকা পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তি হয়ে ছিল, হঠাত দেখা হত, মল চত্বর বা কলা ভবনে। কিন্তু আর কথা হয় নি।

আমি দু:খিত।

Comments

Post a Comment

Popular Posts