সাহেবের হাট


গতকাল জর্ডন রোড দিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাত পেছন থেকে ডাক, ঘুরে দেখি আক্তার ভাই আর মামুন ভাই দাঁড়িয়ে, কাছে গেলাম। আক্তার ভাই জানালেন আগামীকাল সাহেবের হাট ব্যান্ড নিয়ে যেতে হবে, ৫,০০০ টাকা দিয়েছে। চেয়ারম্যান সাহেবের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যান্ড বাজাতে হবে। এখানে বলে রাখা ভাল, আমাদের কচি কাচার মেলার পদ্মকলি শাখাকে ডিসি সাহেব একটা ব্যান্ড সেট দিয়েছেন, আর আমি বাদকদল এর প্রধান। ওনাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, লিজেন এর বাসার সামনে এসে, ওকে ডাকা শুরু করলাম। কিছুক্ষন পর একটা সার্ট পড়ে লিজেন বেড়িয়ে এল। ঘটনা শুনে বলল, নাজিরকেও নিতে হবে, না হলে জমবে না।

পরের দিন আমি, লিজেন, নাজির আর আমাদের পাড়ার ছোট ভাইদের নিয়ে ব্যান্ডসহ লঞ্চ ঘাট এসে হাজির। আমি তখন কলেজ এ প্রথম বর্ষে পড়ি, সময়কাল ১৯৮৩, আমার বয়স তখন ১৭, আর আমাদের সাথের কনিষ্ঠ সদস্যের বয়স ১৪ হবে।

সকালের ঝিরি ঝিরি বাতাস, লঞ্চের সামনে ডেকে বসে আছি, হাল্কা সুর্যের তাপ, একটু ঠান্ডা পরেছে, শীতকাল সমাগত। হাসি ঠাট্টায় ২ ঘন্টা পেরিয়ে গেল, সাহেবের হাট ঘাটে এসে নামলাম। সুন্দর গ্রাম, বরিশালের এ দিকটা ছবির মত, মাঠের মাঝ বরাবর রাস্তা চলে গেছে, দু দিকে, ধান ক্ষেত, নারিকেল গাছ সাড়ি সাড়ি। আর কুড়ে ঘর, মাঝে মাঝে টিনের ঘরে সুর্যের আলো ঝলকাচ্ছে। চোখ ধাঁদিয়ে যায়।

আমরা চেয়ারম্যান সাহেবের অফিসে চলে এসেছি, মাঝ পথে আমাদের সাথে জুটেছে ২০/২৫ জন ছেলে। হাল্কা চা নাস্তা করে, বেড়িয়ে পরলাম, এবার সারা গ্রাম ঘুরে ব্যান্ড বাজাতে হবে, ব্যান্ডের আসল লয় নাজির পরিবর্তন করে, অনেকটা গানের লয় যোগ করে দিল। বাজাতে মজাই লাগছে, আর বিভিন্ন বাড়ী থেকে নানা বয়সী পুরুষ - মহিলা উকি দিচ্ছে, পথের পর পথ, গ্রাম থেকে গ্রাম, শোরগোল পড়ে গেল, আর মিছিল বড় হচ্ছে। মাঝে মাঝে অনুরোধ, ভাই এখানে দাঁড়িয়ে একটু বাজান। বাচ্চারা আবার নাচ জুড়ে দিল।

দুপুর ২-০০ টা নাগাদ চেয়ারম্যান সাহেবের অফিসে ফিরে এলাম, দুপুরের খাবার আয়োজন হয়েছে, নদীর তাজা ইলিশ মাছ, গরুর মাংস, ডাল আর ভাত। খুব খিদে পেয়েছে, সব সাবার করার মত। খেয়ে দেয়ে একটু গা এলিয়ে গাছের নীচে বসা।

বিকেল নাগাদ মাঠে এলাম, ফুটবল খেলা হচ্ছে, আমরা ব্যান্ড বাজিয়ে উৎসাহ দিচ্ছি। দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এল, তাড়াহুড়ো করে ঘাটে এলাম, লঞ্চ ধরতে হবে ফিরতি পথে, বাসায় আবার বলে আসিনি।

দূঢ়ে একটা লঞ্চ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সামনা নয়, পেছন দেখতে পাচ্ছি, পাশে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, এই লঞ্চ কোথায় যাবে, উত্তরে উনি বললেন বরিশাল যাচ্ছে, যাচ্ছে মানে? 

- ছেড়ে গেছে? 

- হ্যা, ওই তো একটু আগেই ছেড়ে গেল।

- পরের লঞ্চ?

- এর পর আর লঞ্চ নাই, কাল সকাল ছাড়া।

- তাহলে আমরা যাব কি ভাবে?

কোন উত্তর নেই, ভয়ে শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, কেউ তো জানে না, আমরা এখানে আটকা পরেছি, কোন ফোন নেই, আর তখন মোবাইল কি, তা কেউ জানত না।

কি আর করা, আবার ফিরে এলাম চেয়ারম্যান সাহেবের দপ্তরে, সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে, হারিকেন জালিয়ে উনি বসে আছেন, দলনেতা হিসেবে আমি একটু কঠোর হয়ে বললাম, আপনি আমাদের লঞ্চে তোলার ব্যবস্থা করেন নি কেন? উনি নির্লিপ্ত ভাবে বললেন, লঞ্চ ছেড়ে যাবে কি করে বুঝব। আমি বললাম, আমাদের নৌকার ব্যবস্থা করেন, আমরা নৌকায় যাব, বাসায় বলে আসিনি। উনি জানালেন, কালিজিরা নদীতে ঢেউ অনেক, আর ডাকাতির ভয় আছে।

সেই রাতে আর যাওয়া হল না, রাতে কোন রকম খেলাম, যেখানে ঘুমের ব্যবস্থা হল, সেখানে মশার কামড়ে থাকা যায় না, সারা রাত বাইরে কাটালাম, সকালে ঠান্ডায় কুঁকড়ে যাচ্ছি।


আর সময় নষ্ট না করে ঘাটে এসে বসে আছি, ঘন্টা খানেক পর লঞ্চ এলো, ফিরতি যাত্রা।

বরিশাল এসে আমার ছোট ভাইদের বাসায় পৌছে দিচ্ছি, আর ওদের বাবা মার কাছে ক্ষমা  চাচ্ছি আর প্রতিজ্ঞা করছি, জীবনে আর কখনো শহরের বাইরে যাব না। শেষ মেশ আমার বাসায় আমাকে কে পৌছাবে, আম্মার অগ্নি মুর্তি কখনো ভোলার নয়। শুনলাম কাল রাতে ভাইয়া অনেক খোজা খুজি করেছে, কেউ স্বীকার করে না, আমাদের কে পাঠিয়েছে, কোথায় আছি। 

দুরুন্তপনা আর এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার এখানেই শেষ।

Comments

Popular Posts