নওয়াব বাড়ী
পুকুর পাড়ে কাঠ বাদামের গাছটা আর নেই, বাড়ীর পেছনে মস্ত বড় একটা বাগান ছিল, আসলে ভূল বললাম, বাগান না বলে জঙ্গল বলাই ভাল, সেথানে একটা বেল গাছ ছিল, ভর দুপুরে যেতে ভয় পেতাম। কাজের লোকদের টাট্টি খানাটা ওখানেই। ওদের বড্ড সাহস।
বন্ধের দিন, পুকুরে নামা চাই ই চাই, সাতার জানি না, তাতে কি, কলা গাছ নিয়েই নামতে হবে। এ মাথা থেকে ও মাথা, সাবমেরিন চালাতাম। উঠতে ইচ্ছেই হত না। কলা গাছের ডগা দিয়ে দারুন বন্দুক হত, মাঝে মাঝে ফালি কেটে, হাত দিয়ে টান দিলেই, ফটাফট শব্দ। একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব ছিল। পেছনের ফলসা গাছটা আমি আর কোথাও দেখি নি, ছোট ছোট ফল, পাকলে বেগুনী হয়ে যেত। তার পাশে একটা পেয়ারা গাছ ও চালতা গাছ। সন্ধ্যে হলে ওখানে অনেক ডাহুক আসত। বাড়ীর নীচে একটা সুরঙ্গ ছিল, তার মধ্য থেকে বেজী আর গুই সাপ বের হত। একবার একটা দাশবাঘও দেখেছি। পেয়ারা গাছের নীচে একটা কুয়া ছিল, আগে হয়ত কূয়া থেকে পানি তোলা হত। মূল বাড়ী থেকে রান্না ঘর আলাদা ছিল।
১৯৭১ সালের আগের স্মৃতি আমার কাছে অনেকটাই অস্পষ্ট, বয়স তখন ৬ বছর হবে, তবে দেশ স্বাধীন এর পরের কথাই বেশী মনে পড়ে। হঠাৎ বাজারে চালের আকাল হল, আমাদের বাসায় ছিল মেহের আলী বাবুর্চী, আমরা দাদা বলে ডাকতাম। খুজে টুজে লঞ্চ ঘাটের আড়ত থেকে এক বস্তা চাল নিয়ে্ এল, সবাই খুশী, পাওয়া গেল তাহলে। ভিখেরীরা এলে ভাত চাইত না, শুধু মাড়ের জন্য বায়না করত। অভাবটা আসলেই বড় কষ্টের। থাক সেকথা।
বাড়ির নাম করণ
বাড়ীর নামকরণ কেন নওয়াব বাড়ী হ’ল, সেটা বলি। আমার দাদার নাম নওয়াবজাদা সৈয়দ ফজলে রাব্বি এবং তার পিতার নাম নওয়াব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন। সায়েস্তাবাদের নওয়াব, যেখানে ছিল বিশাল অট্টালিকা। কিন্তু নদী ভাঙনে তা আর রক্ষা করা যায় নি, আড়িয়াল খা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। অতঃপর বরিশাল শহরে ব্রিটিশদের একটা বাড়ী কেনা হয়। যা সায়েস্তাবাদ লজ বা নওয়াব বাড়ী নামে পরিচিত। আমাদের বাড়ীটা প্রায় আধা একর এর উপর ছিল। আমার দাদা তার স্ত্রী, পাচ পুত্র ও তিন কন্যা নিয়ে এখানেই বসবাস শুরু করেন। পাকিস্তান শাসনামলে আমার মেঝ ফুপা এ, টি, এম মুস্তাফা ছিলেন তথ্য মন্ত্রী । ফুপা ভাল ক্রিকেট খেলতেন। মুস্তাফা ফুপার ছোট ভাই এ, কে, এম মুজতাবা আমার ছোট ফুপা, শিল্পকলা একাডেমীর সাথে যুক্ত ছিলেন। দারূন বাশী ও বেহালা বাজাতেন। আমার দূর্ভাগ্য ওনার কাছে শেখার সুযোগ হ’ল না।
বাড়ির নাম করণ
![]() |
| নওয়াবজাদা সৈয়দ ফজলে রাব্বি |
বরিশাল জিলা স্কুল
![]() |
| নওয়াব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন |
বসন্ত আর শীতকালে খুব ঘুড়ী ওড়াতাম। আমাদের বাসার সামনে বিরাট মাঠ ছিল, আম্মার ভয়ে মাঝে মাঝে ঘূড়ি ও নাটাই সিমা আপাদের বাসায় রাখতাম। আমাদের পাশেই ছিল ওনাদের বাসা। অনেক বোন রেহানা আপা, সুলতানা আপা, দিলশু আপা, সাম্মু আপা আর সিমা আপা। ওনাদের বাবা মাকে দাদা দাদি ডাকতাম, দাদার নাম ছিল আমির হোসেন, ওনাদের সাথে আমাদের একটা জটিল আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। ওনাদের আদি বাড়ী হয়ত কোলকাতা, দেশ বিভাগের পর এদেশে চলে আসেন। উর্দু কথার প্রচলন ছিল ওনাদের বাসায়।
বরিশাল জিলা স্কুল
এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন স্বনামধন্য স্কুল এবং এটি বরিশাল বিভাগে প্রতিষ্ঠিত প্রথম স্কুল। মূলত ঐতিহাসিক বরিশাল জিলা স্কুল তৎকালীন বরিশাল জেলার জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট মি. এন. ডব্লিউ গ্যারেট এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নির্মিত হয়। তাঁর নির্দেশনায় ১৮২৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর স্থানীয় জনসাধারণের আর্থিক সহায়তায় শ্রীরামপুর মিশনের মাধ্যমে বরিশাল ইংলিশ স্কুল নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মাত্র আটজন ছাত্র নিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয় ও ছাত্রসংখ্যা সে বছর ২৭ জনে গিয়ে দাঁড়ায়।
প্রথম দিকে বিদ্যালয়টি মিশন কর্তৃক পরিচালিত হত। সেসময় বিদ্যালয়টি (প্রোটেস্ট্যান্ট গীর্জার পশ্চিম দিকে) স্থানীয় জমিদার মি. লুকাসের জমির মধ্যে স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে ব্রাউন কম্পাউন্ড এবং ১৮৪২ সালে বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়। ওই জমির মালিক ছিলেন মি. স্পেনসার। তৎকালীন বাংলার গভর্নর এর নির্দেশ মোতাবেক জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং স্কুলের সেক্রেটারি ই জে বার্টন সরকারকে বিদ্যালয়টি উন্নয়নের জন্য বিশেষভাবে তাগিদ দিতে থাকেন। তিনি নিজ প্রচেষ্টায় অভিজাত ব্যক্তিবর্গের নিকট থেকে ৩৮,৮১৭ টাকা চাঁদা তোলেন এবং তা সরকারের কাছে হস্তান্তর করেন। ফলাফল স্বরূপ বিশাল পরিমাণ জমির উপর বরিশাল জিলা স্কুল নির্মিত হয়।
১৮৫৩ সাল থেকে ১৮৯১ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার এই বিদ্যালয়ের ব্যয়ভার গ্রহণ করে এবং তখন থেকে এর নামকরণ হয় বরিশাল জিলা স্কুল । সে সময় স্কুলের ছাত্র সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০০ জন। বরিশাল শহরে কয়েকটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে ১৮৯২ সালে সরকার জিলা স্কুলকে বেসরকারি ঘোষণা করা হয়। সায়েস্তাবাদের জমিদার সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন বাংলার গভর্নরকে স্কুলের জন্য অর্থ ও জমি প্রদানের আশ্বাস দেওয়ার পর ১৯০৬ সালে পুনরায় এটিকে সরকারীকরন করা হয়। ১৮২৯ সালে এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন মি. জন স্মিথ। ১৯৬১ সাল থেকে এই স্কুলকে পাইলট স্কুলে পরিণত করা হয়। তখন আমেরিকান বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে এর নানাবিধ পরিবর্তন ও সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করা হয়।
অবকাঠামো
১৮০ বছরের প্রাচীন বিদ্যালয়টির জমির পরিমাণ ২০ একর। বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক ভবনসহ একাডেমিক ভবনের সংখ্যা ৬টি। স্কুলে ১টি মসজিদ, ১টি ছাত্রাবাস, প্রধান শিক্ষকের বাসভবন ও ২টি খেলার মাঠ রয়েছে।
দুঃখজনক বিষয় ---
বরিশাল জিলা স্কুলের ঐতিহ্যবাহী দুইশত বছরের পুরাতন একাডেমিক ভবনটি তৎকালীন এরশাদ শাসনামলে ভেংগে ফেলা হয়। (সংগৃহীত)।
আমার মেজ চাচা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন
আমার মেঝ চাচা খেলাধূলার সাথে জড়িত ছিলেন, বরিশাল ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস এসোসিয়েশনের অনারারী সেক্রেটারী ছিলেন। কামাল ভাই নামে খুব পরিচিত, যদিও আসল নাম ছিল সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন। পেশায় এডভোকেট। কিছু মজার ঘটনা শেয়ার করি। খুব সকালে দুটো রিক্সায় সাজি ভড়া মুরগী, ফল, দই নিয়ে মক্কেল এসেছে, আমি আর ভাইয়া দৌড়ে গিয়ে চাচাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। চাচা এলেন, ওদের কথা শুনলেন, তারপর বললেন, আমিতো মার্ডার কেস করি না, আর এগুলো নিয়ে যান। ওরা জোর করল, হুজুর মুরগীগুলো রেখে দেন, চাচা রাজি হল না। পরে শুনেছি, এই কেস ওনার বন্ধুরা করতেন, আর মার্ডার কেসে অনেক পয়সা। আরেক দিনের ঘটনা, আমাদের বাড়ীর পশ্চিম দিকে অনেক কাঠালের গাছ ছিল, খেতে খুবই সুস্বাদু। এক ধরণের কাঠাল ছিল, ওজনে দশ কেজি হত, কোয়া গুলো একটু শক্ত, আমরা বলতাম আজা কাঠাল, আজা অথবা খাজা হবে। বেশ সকাল, হঠাৎ শুনলাম পুলিশ এসেছে বাসায়, কামাল চাচাকে জানান হ’ল, উনি পুলিশের সাথে কথা বললেন, আর একটু পর বেড়িয়ে গেলেন। সাথে ওনার পিওন কালু ভাই। কি হ’ল, কেন গেল। পরে শুনলাম রাতে আমাদের গাছ থেকে অনেক কাঠাল চুরী হয়েছে, আর পুলিশের হাতে ধরা পরেছে, চোর কেউ নয়, আমাদের বাসার পুরাণ এক কাজের লোক, আদম আলী ও তার ছেলে। চাচা থানায় গেলেন, অভিযোগ তুলে নিলেন, ওদের ছেড়ে দিতে বললেন, আবার যাওয়ার সময়, গাড়ী ভাড়া দিয়ে দিলেন। পুলিশ জিজ্ঞেস করল, কাঠালের কি হবে। চাচা উত্তর দিলেন আপনারা খেয়ে নেন। বাসায় এস মূখ ভারী, কিন্তু কাউকে কিছু বললেন না। কামাল চাচাকে আমরা দু’ভাই বাডা বলে ডাকতাম।
আমার মেঝ চাচা খেলাধূলার সাথে জড়িত ছিলেন, বরিশাল ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস এসোসিয়েশনের অনারারী সেক্রেটারী ছিলেন। কামাল ভাই নামে খুব পরিচিত, যদিও আসল নাম ছিল সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন। পেশায় এডভোকেট। কিছু মজার ঘটনা শেয়ার করি। খুব সকালে দুটো রিক্সায় সাজি ভড়া মুরগী, ফল, দই নিয়ে মক্কেল এসেছে, আমি আর ভাইয়া দৌড়ে গিয়ে চাচাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। চাচা এলেন, ওদের কথা শুনলেন, তারপর বললেন, আমিতো মার্ডার কেস করি না, আর এগুলো নিয়ে যান। ওরা জোর করল, হুজুর মুরগীগুলো রেখে দেন, চাচা রাজি হল না। পরে শুনেছি, এই কেস ওনার বন্ধুরা করতেন, আর মার্ডার কেসে অনেক পয়সা। আরেক দিনের ঘটনা, আমাদের বাড়ীর পশ্চিম দিকে অনেক কাঠালের গাছ ছিল, খেতে খুবই সুস্বাদু। এক ধরণের কাঠাল ছিল, ওজনে দশ কেজি হত, কোয়া গুলো একটু শক্ত, আমরা বলতাম আজা কাঠাল, আজা অথবা খাজা হবে। বেশ সকাল, হঠাৎ শুনলাম পুলিশ এসেছে বাসায়, কামাল চাচাকে জানান হ’ল, উনি পুলিশের সাথে কথা বললেন, আর একটু পর বেড়িয়ে গেলেন। সাথে ওনার পিওন কালু ভাই। কি হ’ল, কেন গেল। পরে শুনলাম রাতে আমাদের গাছ থেকে অনেক কাঠাল চুরী হয়েছে, আর পুলিশের হাতে ধরা পরেছে, চোর কেউ নয়, আমাদের বাসার পুরাণ এক কাজের লোক, আদম আলী ও তার ছেলে। চাচা থানায় গেলেন, অভিযোগ তুলে নিলেন, ওদের ছেড়ে দিতে বললেন, আবার যাওয়ার সময়, গাড়ী ভাড়া দিয়ে দিলেন। পুলিশ জিজ্ঞেস করল, কাঠালের কি হবে। চাচা উত্তর দিলেন আপনারা খেয়ে নেন। বাসায় এস মূখ ভারী, কিন্তু কাউকে কিছু বললেন না। কামাল চাচাকে আমরা দু’ভাই বাডা বলে ডাকতাম।
আমার বাবা সৈয়দ ফয়েজ রাব্বি
![]() |
| বাব মা এর সাথে আমরা দু’ভাই |
বেগম সুফিয়া কামাল
দেশ স্বাধীনের কিছু পরে হবে, হঠাৎ শুনলাম বেগম সুফিয়া কামাল আসছেন বরিশাল, আমাদের বাসায় বেশ আলোচনা হচ্ছে, সম্ভবত উনি আমাদের বাসায় আসবেন, সারাদিন অপেক্ষা হল, এলেন না। বিকেলে দেখি আম্মা কাপড় পড়ে তৈরী। কোথায় যেন যাবেন, সাথে আমাকেও যেতে হবে। আমরা রিক্সা করে শ্রী চৈতন্য স্কুলে এসে হাজির হলাম, আম্মা গটগট করে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন, সাথে আমি। সাদা শাড়ী পরা এক বয়স্ক মহিলা মঞ্চে বসা, আম্মা গিয়ে রীতিমত ঝগড়া্। বরিশাল এলে, তবে বাসায় এলে না কেন? আমরা কি তোমার কেউ না? পরে জানলাম উনি আব্বার ফুপাত বোন এবং ওনার ছোটবেলা কেটেছে, আমাদের সায়েস্তাবাদের নওয়াব বাড়ীতে। ১১ বছর বয়সে ওনারই মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেন এর সাথে ওনার বিয়ে হয়।
পরের দিন সুফিয়া কামাল (আমার ফুপু) এলেন আমাদের বাসায়, মেহের আলী দাদা চলে গেলেন বাজারে, দুপুরে আমাদের খাবার টেবিলে বিশাল আয়োজন, আমাদের টেবিলে একসাথে ১২ জন খেতে বসত। বড় বড় চিংড়ি, কই, ইলিশ মাছ এর পাতুরী, ইলিশের ডিম, খাসির গোস্ত আরো কত কি। ফুপু সামনের কামরার বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে গল্পে মশগুল, সামনের রুপোর পানের বাটা, সেখানে ছোট ছোট পানের খিল্লি। ফুপু অবশ্য পরের দিনই চলে গেলেন, রেখে গেলেন স্মৃতি, যখনই বইয়ে ওনার কবিতা পড়তাম, ওনার কথা মনে পড়ত।
ধানমন্ডি রোড নং - ১৮
আমার স্মৃতির একটা বিশাল অংশ জুড়ে আছে, ধানমন্ডি ১৮নং সড়কের এই বাড়িটি। ছোট্ট বেলা বারান্দায় দাঁড়াতাম, রোদ ঝলমল দিন, রাস্তায় হঠাৎ ডাক শোনা যেত, এই পেপার। এরকম ডাক বরিশালে শোনা যায় না, আবার আরেকটা আকর্ষণ ছিল আইসক্রিম। ইগলু ইগলু বলে যখন ঘন্টা বাজাত আর এই ইগলু বলে ডাক দিত, ছুটে যেতাম, তবে সব সময় ইগলু খাওয়ার পয়সা হতো না, আরো ছিল রনি আইসক্রিম। তখন বরিশাল থেকে ঢাকা যেতাম স্টীমার এ চড়ে। গাজী, মাসুদ, টার্ন আর লেপ্চা, অনেকগুলো স্টিমার ছিল। তবে আমার পছন্দ ছিল গাজী রকেট। প্রথম শ্রেণীর ব্যাপারই ছিল আলাদা। ডাইনিং হলে সাদা ড্রেস পরে বাটলার খাবার পরিবেশন করত, সকালে দুটো ডিম্ ফ্রাই, ব্রেড টোস্ট, মাখন আর গরম গরম চা অথবা কাটলেট এর সাথে পটেটো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর সস। দুপুরে বা রাতে মুরগি/মাছ, সবজি, ডাল আর ভাত, সাথে সালাদ। মুরগির রান্নাটা হত চমৎকার, এমন স্বাদ আমি আর কোথাও পাই নি। ডালের বাটিটা ছিল নৌকার মত দেখতে। তারপর পুডিংটা না খেলেই নয়। এই বাড়িতে থাকতেন আমার ছোট ফুপা, নাম এ, কে, এম, মুজতাবা। সবার কাছে প্রিয় ময়না ভাই নামে, সে ওনার কর্মস্থল হোক, কি পরিবার।
এ বাসার আকর্ষণই ছিল আমার ফুপা। তারেক চাচা থাকতেন ফুপার সাথে। আমার এ চাচা ছিলেন চিরকুমার, আর আমাদের কাছে অনেক প্রিয়। আমার ফুপাত বোন সারাহ আপা আমার অল্প বড় হলেও ভাবখানা ছিল অনেক বড়, আমি মেনে নিতাম। আমার কোন বোন না থাকায় আমার কাজিনরা সে জায়গাটা পূরণ করেছে। তিনতলায় ছিল আলা চাচা, ফুপার ছোট ভাই, ওনার ছেলে সাহেদ আমার কিছুটা ছোট। ভাল ক্রিকেট খেলতো। ১৯৮০ সল্ হবে, ঢাকা এসেছি ছবি আকার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে একা, উঠলাম এই বাসায়, তারেক চাচা আমার হাতে ১০০ টাকা দিয়ে বললেন, খরচ করিস। ঢাকা শহর বাসে করে চষে বেড়ালাম, টাকা তো ফুরায় না। আমাকে আবার নিউ মার্কেট নিয়ে অনেক রং, তুলি আর পেন্সিল কিনে দিয়েছিলেন। প্রেরণাটা এভাবেই আসে, যখন কেউ সহযোগিতার হাতটা বাড়ায়।
যে দিন ফুপু এই বাসা ছেড়ে উত্তরা যান, আমার খুব খারাপ লেগেছিল। মনে হচ্ছিল এটা তো আমাদেরই বাসা।
লাকুটিয়ার জমিদার বাড়ী ও এন হোসেন পরিবার
আমাদের বাড়ীর পশ্চিম দিকে প্রায় ২ একর জমি নিয়ে যে দোতালা বাড়ীটি ছিল, তা এক সময় লাকুটিয়ার জমিদারদের মালিকানায় ছিল, আর আম্মার কাছে দূর্গা ও পংকজ নামগুলো প্রায়ই শুনতাম। শোনা যায়, এন হোসেন সাহেব সোনার ব্যবসা করতেন ও এই বাড়ির একটা অংশ ভাড়া নেন। পরবর্তী কালে নাম মাত্র মূল্যে দুর্গার মার্ কাছ থেকে বাড়িটি কিনে মালিক হন। কিন্তু তিনি বেশী দিন বাড়িটি ভোগ করতে পারেন নি, আর মারা যাওয়ার পর বাড়িটি চলে আসে ভাইদের দখলে, অর্থাৎ কালু ও শহিদুল নাম ওনার দুই ভাই ছিল, তারা সব কিছু দেখা শোনা করতে লাগলেন। রাতারাতি এন হোসেন জুয়েলার্স এর মালিকানা এন হোসেন এন্ড সন্স থেকে এন হোসেন এন্ড ব্রাদার্স হয়ে গেল। এই বিষয়গুলো কেন আনলাম তা এবার ব্যাখ্যা করি। এন হোসেন সাহেবের ছিল তিন ছেলে আর তিন মেয়ে, আনোয়ার ভাই আর রফিক ভাই থাকতেন আমেরিকায়। ছোট ছেলে সোলায়মান আমার বয়সী আর এই বাড়িতেই থাকত। সোলায়মান এর তিন বোন জহুরা আপা, খাদিজা আপা ও ফাতেমা আপা এই বাসার নিচ্ তলায় মা আর ছোট ভাই নিয়ে থাকতেন। ছোট বেলা ওনাদের সচরাচর দেখতাম না, শুধু সোলায়মান কে মাঝে মাঝে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। ওদের দুরাবস্থার কথা ঐ বাড়ির কাজের লোকদের কাছে শুনতাম। ওদের বাসার সামনে একটা বেকারী ছিল, নাম হুগলী বেকারি। আমরা কেক, বিস্কিট, ক্রিমরোল কিনতে ওখানে যেতাম। মাঝে মাঝে সোলায়মান আমার মোরগ এর সাথে ওর মোরগের যুদ্ধ করতে নিয়ে আসত। যখন জোহরা আপার বিয়ে হয় তখন সোলায়মান এর সাথে আমার খুব বন্ধুত্ত্ব। ওদের যখন খারাপ অবস্থা তখণ আনোয়ার ভাই আমেরিকা থেকে ফেরত আসেন আর কিছুদিন পর গোলাম মাওলা সাহেবের (তৎকালীন বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যান) মেয়ে বনা আপাকে বিয়ে করেন। আমি আর পলাশ এই বিয়েতে খুব মজা করেছি। পলাশ ভাল গান গাইতো, সেকারণে ওর নারী মহলে বেশ দাম ছিল, আর ও বেশ এই সুজোগ কাজে লাগত। ওই বাসায় ছোট বেলা যেতাম, কিন্তু কেমন জেন্ এক গা শিউড়ান ভাব ছিল, ভয় ভয় লাগত। শুনশান পরিবেশ, খুব একটা লোকজন দেখা যেত না, ফাতেমা আপা খুব সুন্দরী ছিলেন, ওদের বাসায় গেলে মাঝে মাঝে রূহ আফজার শরবত বানিয়ে আনতেন, ভেতর ঘরে উঁকি দিলে দেখতাম, মানুষ এর শুধু ছায়া দেখা যায়, মানুষ আর দেখতে পেতাম না।
কলমী লজ
হঠাৎ আজ সকালে বাবলু চাচার ফোন পেলাম, একটু আশ্চৰ্য হয়েছি, আবার দ্বিধায় পরেছি। সব ঠিক আছে তো, নাকি আবার কোন খারাপ খবর শুনতে হবে। বাবলু চাচাদের সাথে যোগাযোগ আমাদের বহু বছরের, ছোট বেলা আম্মার সাথে আমানতগঞ্জ, কলমী লজ এ বেড়াতে যেতাম। বাবলু চাচা আমার আজাদ ও তারেক চাচার বন্ধু, তাছাড়াও পারিবারিক বন্ধু বলা যায়। আমার বয়স তখন কত হবে, সাত কি আট, আজাদ চাচার সাথে ঢাকা এসেছি দাঁতের এক্সরে করাব বলে, তখন বরিশালে হাবিবুর রহমান ডাক্তার সাহেব দাঁতের চিকিৎসা দিতেন, কিন্তু এক্সরের ব্যবস্থা ছিল না। গুলিস্থানে কোথাও হবে এক্সরে করাব, হঠাৎ দেখা হয়ে গেল বাবলু চাচাদের সাথে। ওনার নববধূ, বোন আর আমরা গিয়ে হাজির হলাম গুলিস্থানের এক চায়নীজ রেস্টুরেন্টে, সম্ভবতঃ এটাই ঢাকার প্রথম চাইনীজ নাম হয়ত চি চৌ চিং, হয়ত ভুল হতে পারে। বলার কারণ হলো, আমাদের ৬ জনের বিল দেয়ার জন্য বাবলু চাচা ১০০ টাকা দিলেন, আর কিছুক্ষন পর ওয়েটার এসে বাকি টাকা ফেরত দিল, টাকার মান কোথায় গিয়েছে ভাবলে অবাক লাগে। বাবলু চাচার মেয়ে তানিয়া আবার আমার মেজ চাচার মেয়ে তানিয়ার সময় বয়সী। আরেক সমবয়সী তানিয়া আছে, হুদা চাচার মেয়ে। হুদা চাচার বিষয় পরে আসবো। কলমী লজ বাড়িটা আমার কাছে একটু অন্যরকম মনে হত, একটা গা ছমছম ভাল ছিল। সামনে বেশ খোলা জায়গা, একতলা টিনের ঘর, দেয়ালটা হয়ত ইটের গাঁথুনি ছিল, বেশ অনেকগুলি কক্ষ। আমরা গেলে মাঝের কক্ষে বসতাম।আম্মা অনেক্ষন ধরে গল্প করত, তারপর আবার রিকশায় করে ফেরা।






Comments
Post a Comment